বিজয়ের কবিতায় মানবপ্রেম


Published: 2016-12-13 12:23:07 BdST, Updated: 2017-09-22 23:03:45 BdST

 

 

ফ জ লু ল হ ক সৈ ক ত: ‘আসমানের তারা সাক্ষী/সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই/ নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী/সাক্ষী এই জারুল, জামরুল সাক্ষী/পুবের পুকুর আর ঝাকড়া ডুমুরের ডালে স্থির দৃষ্টি/মাছরাঙা আমাকে চেনে/আমি কোনো অভ্যাগত নই/খোদার কসম আমি ভিনদেশী পথিক নই/আমি কোনো আগন্তুক নই।’

কবি আহসান হাবীবের এই অবস্থান প্রসঙ্গ ও আত্মপরিক্রমায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে প্রত্যয়, তা আমাদের নিজস্ব শক্তি। এই শক্তিই শিল্পকে সাহিত্যকে বারবার স্বাধীনতার সাথে সম্পৃক্ত করে। বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের একটি টার্নিং পয়েন্ট হলো ১৯৭১ সাল। আর তার অন্তরালে ছিল মূলত স্বাধীনতার প্রত্যাশা এবং জাতীয় চেতনার প্রতি বিশ্বস্ততা। বিষয়টি প্রবলভাবে রাজনৈতিক হলেও এর সাংস্কৃতিক চরিত্র আছে। বাঙালির সব সংগ্রামে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সবসময় উপাদান ও প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৭১ও তার ব্যতিক্রম নয়। শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা ও স্তরের মতো কবিতাও সর্বদা সতর্ক থেকেছে প্রহরীর ভূমিকায়। আর দিকনির্দেশনা এবং ধারাবিবরণীও কবিতার একটি জরুরি দায়িত্ব বলে বারবার প্রমাণিত।

কবি আবুল হোসেন বলেছিলেন :
‘যেখানে মানুষ থাকে, থাকবেই জঞ্জাল, দুর্গন্ধ,/কিছু বিশৃঙ্খলা, হই হুল্লোড়, কী এমন হল তাতে?/ অনেক গোয়াল, আস্তাবল, এমনকি শুয়োরের খোয়াড়ও এর চেয়ে ভালো
(মানুষ যায় না ঘর ছেড়ে)।

তবে মানুষ চায় নিজের মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে। বাঁচাতে চায় নিজস্ব জমিনের অধিকার। ‘অগ্রজের পদচিহ্ন’ কবি কবিতায় আতাউর রহমান লিখেছেন :

‘অগ্রজের রক্তাক্ত পদচিহ্ন ধরে/আমি এগিয়ে চললাম গভীর অন্ধকার ছিন্ন করে/আমি সূর্যোদয়কে সম্ভব করলাম।’

কবি শামসুর রাহমান দেশভাগ-পরবর্তীকালে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। ভারতবিভাজনের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে ছিটকেপড়া ঢাকাকেন্দ্রিক আনকোরা সাহিত্যচর্চার এক ক্রান্তিলগ্নে তাঁর কবিজীবনের প্রারম্ভ। একদা ‘বিবরবাসী অন্তর্জীবনে সমর্পিত’ কবি, ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠলেন ‘বহির্জীবনের প্রতি মনোযোগী এবং রাজনীতি-মনস্ক’। তাঁর কবিতায় জাতির আত্ম-জিজ্ঞাসার ভাষা নির্মিতি লাভ করেছে। রাহমানের কবিধর্ম হলো

মানবতাবিরোধী কর্মযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। পরাধীনতা ও শোষণের গ্লানিমোচনের যে মানবিক আকাক্সা তিনি বর্ণনা করেছেন, তা একজন কথা কারিগরের আপন-অভিব্যক্তিরই বহির্প্রকাশ মাত্র। স্বাধীনতার জন্য আকুল অপো, প্রজন্মপ্রহর আর অর্থনৈতিক স্থিতি-অস্থিতির কালযাপনের কান্তি শামসুর রাহমান অনুভব করেন ‘শূন্য থালা হাতে’ ‘পথের ধারে’ বসে-থাকা ‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী’র উপলব্ধির গাঢ়তায়। কবি বাঙালি জাতির মনন-


চেতনকে আঁকছেন এভাবে : ‘তোমার জন্যে,/সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ন কৃষক,/কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,/মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দ মাঝি,/গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে/ রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা, যার ফুসফুস/এখন পোকার দখলে/আর রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো/সেই তেজী তরুণ যার পদভারে/ একটি নতুন পৃথিবী জন্ম হতে চলেছে/ সবাই অধীর প্রতীা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)।

সেই প্রত্যাশিত স্বাধীনতার উপমান তাঁরই কবিতায় কত-না বিপুল-ব্যাপৃত। ‘রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’ আর নজরুলের ‘সৃষ্টিসুখের উলাসে কাঁপা’ সৃজন-ব্যাকুলতায় জনতাকে যেন হাতড়ে ফিরতে হয় স্বাধীনতার স্বাদ।


তিনি লেখেন : ‘স্বাধীনতা তুমি/বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিার্থীর/শাণিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।/স্বাধীনতা তুমি/চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ। ... স্বাধীনতা তুমি/গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,/হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।/স্বাধীনতা তুমি/খোকার গায়ে রঙিন কোর্তা,/খুকীর অমন তুলতুলে গালে/রৌদ্রের খেলা’ (স্বাধীনতা তুমি)।
প্রকৃতির নির্মলতা-স্বাভাবিকতা, পরিবার ও সমাজের নীতিপ্রীতি-ধর্মযাপন, মায়ের আনন্দ, বোনের খুশি, সাফল্যের পথে বন্ধুর এগিয়ে চলাÑ সবকিছুর ভেতরে লুকিয়ে থাকে ঝিনুকের মোড়কে থাকা মুক্তার মতো সম্ভাবনা।


শামসুর রাহমান মায়ের শুকাতে-দেওয়া শাড়ি আর বোনের মেহেদিরাঙা হাতের আহ্বানে দেখতে পান শান্তিনিবিড় মাতৃভূমি। বাবার প্রার্থনারত হাতের তালুতে ঝুলতে থাকা থোকা থোকা স্বপ্ন বুনতে চান তিনি স্বাধীন দেশের উর্বর মাটিতে। আর ঘরে ঘরে নির্মাণ করতে চান অফুরন্ত শান্তির সুবাতাস। স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করা নয়; তারও আছে সীমারেখা, রয়েছে মাপকাঠি।


প্রাপ্তির স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশে আমরা যেন দিশেহারা হয়ে না পড়ি; সীমানা অতিক্রম না করি সে বিষয়ে কবি শামসুর রাহমান আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন‘স্বাধীনতা তুমি... যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা’ বলে। জাতির বিপর্যয়, অনাকাক্সিত দুঃশাসন, অবরুদ্ধ জীবনের যন্ত্রণা শামসুর রাহমানের বোধ আর দায়গ্রহণের মানসিক শীতল-উর্বর ভূমিতে গড়েছে কবিতাসৃজনের শান্ত পরিসর।

আলাউদ্দিন আল আজাদ বামপন্থী চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর কবিতার এক বিরাট পরিসর সংগ্রামী চেতনাসমৃদ্ধ এবং বোধজাগানিয়া উপলব্ধিতে সমুজ্জ্বল হলেও কাব্যসম্ভারের অনেকাংশেই প্রেম ও প্রকৃতিনির্ভর, ব্যক্তিগত ভাবানুভূতি, আবেগ-আর্তি এবং স্বপ্ন-কল্পনা-আশ্রয়ী, নারী-প্রেম এবং ব্যাপকঅর্থে মানবপ্রেম উপজীব্য হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এবং সরকারি চাকরির কারণে বিদেশে বিশেষত রাশিয়ার মস্কোতে অবস্থানকালে রচিত অধিকাংশ খণ্ড কবিতায়-বিশেষভাবে সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতায় ব্যক্তিমনের ভাবানুভূতি বিচিত্ররূপে প্রকাশ পেয়েছে।


কোথাও কোথাও তির্যকতা এবং কিছুটা ব্যঙ্গের ছোঁয়াও লেগেছে। কিন্তু আলাউদ্দিন আল আজাদ এ পর্যায়ের কবিতায় উচ্চকণ্ঠ নন, বরং অনেকটা আত্মনিমগ্ন বা আত্মসমাহিত। পূর্বসূরীদের ভাবনাধারার প্রভাব ও পরিগ্রহণকে আত্মস্থ করে আলাউদ্দিন আল আজাদ নিজের কাব্যরীতি ও কাব্যবৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে নিয়েছেন; যোগ করেছেন ব্যক্তিগত ও বৈশ্বিক অনুভবরাজি। আবার সমাজ বদলে সৈনিকের ভূমিকা পালনের আকাক্সা প্রকাশ করলেও, তিনি কবিতাকে নিছক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি;

কবিতায় শৈলী নির্মাণের দিকেও বিশেষ দৃষ্টি রেখেছেন। আর এই শৈলীতে স্থান পেয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অলিগলির বাঁকা পথ; যুক্ত হয়েছে দু’পাশের দৃশ্যাবলি এবং জনস্রোত। সভ্যতার নিচু স্তর থেকে ক্রমাগত উপরে ওঠার সিঁড়ি হাতরে ফিরেছেন তিনি। গণতন্ত্রের হাহাকার ছিল তাঁর; যদিও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই বিশেষ তন্ত্রের চেহারা টুকুর ছিটেফোঁটাও চোখে দেখে যেতে পারেননি। তবে তাঁর সে আবেগ ধরা রয়েছে কবিতার সেলুলয়েডে; এই মাটিলতাময় পৃথিবীর কাব্যপাঠের আসরেও হয়তো দোল খাবে তাঁর গণতন্ত্র-বিষয়ক ধারণারাজি।

আমরা জেনে নিতে পারি তাঁর ভাবনার গণতন্ত্রের রূপরেখা : ‘ঝোপঝাড় মাঠবন প্রান্তরের/শরীরে জড়ানো সবুজ কাঁথায়/লেখো পুষ্পের বর্ণলিপিতে, লেখো/লেখো আমি গড়ে তুলি গণতন্ত্র!/ ধানের গমের গুচ্ছ গণতন্ত্র/পাটের তুলোর জন্ম গণতন্ত্র/ুধার তৃষ্ণার তৃপ্তি গণতন্ত্র/দিনের রাতের দীপ্তি গণতন্ত্র’ (গণতন্ত্র) এই পৃথিবীর পথে-প্রান্তরের চেনা সন্তান
আলাউদ্দিন প্রবল অস্তিত্ব সচেতন। চারপাশের বনবাদার-নদী-সমুদ্র-বীজতলা তাঁর জানা; তাঁকে চেনে এসব দৃশ্যাবলির আদি-অন্ত সীমানা।

প্রেম আর রোমান্টিকতাকে আশ্রয় করে কবিতাচর্চা আরম্ভ করলেও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ পরবর্তীকালে দেশমাতা-নিজভাষা, মাটি-মানুষ আর প্রজন্ম-পরিক্রমার কবি হিসেবে স্থিতি অর্জন করেন। ওবায়দুল্লাহর প্রেরণামুখী কবিতা ‘বৃষ্টি এবং সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’। তিনি এই কবিতায় প্রয়োগ করেছেন শান্তিময় পৃথিবীর কোমল প্রার্থনা।


প্রসন্ন-উর্বর মাটি, দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন উদার চোখ, শূন্যবৃত্তের গভীরে সঙ্গীতময়তা, গোলাপের ছড়ানো নিবিড় সুখস্পর্শ, শুকনো পাতার অসহায় ভঙ্গি, নিঃসঙ্গতা প্রভৃতির পাঁজরে বাঁধতে চান কবি, বৃ-মৃত্তিকা-কৃষক-শস্য-ভালোবাসার বর্ণাঢ্য অভয়-অরণ্য। কবির অনুভব :
‘পাখিরা বসতে পারে এমন কোন বৃ নেই/জোনাকি লুকাতে পারেন

এমন কোন গুল্ম নেই/ সূর্য শীতল হবে এমন কোনো নদী নেই/এবং আমার বিচিত্র শব্দাবলি বিবর্ণ/ বৈশাখের শিলাপাতে আহত শস্যের মত বিচূর্ণ/যুবকের বুকে ভালোবাসার মতো আগ্নেয়াস্ত্র/এক টুকরো খামারের জন্য,/মেয়েরা শেফালির ঝুড়িতে আগুন চেপে ঘুরে বেড়ায়/অথচ ওরা মা হতে পারতো/এবং আমার চিৎকার মাটির নিম্নতম শূন্যতায়Ñ/যে সাহসী সে যুদ্ধে গেছে/যারা যুদ্ধে যায় তারা ফিরে আসে না।’


হৃতগর্ব দেশমৃত্তিকার ঐতিহ্য আর মর্যাদা ফিরে পাওয়ার হাহাকার-প্রার্থনা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর এই কবিতায় পরিব্রাজকের অন্তর্লীন মন্দ্রিত কষ্ট-পাবনের মতো দাগ কেটে গেছে। তাঁর প্রার্থনা দুর্বলচিত্ত-ভীতিপ্রবণ অলস মানুষের জন্য নয়; সাহসী পুরুষের জন্য। নিষ্ফলা মাঠে কৃষক-পুরুষের আর্তনাদ, ভালোবাসার যুবকহীন বাড়ির রমণীদের আহাজারি আর সুবাতাস এবং ফসলবতী মা-গাভী-শস্যবৃরে অধীর প্রত্যাশার গল্প বলতে গিয়ে, প্রকৃতঅর্থে, কবি স্বাধীনতাকেই আহ্বান করেছেন অগণিত উন্মুখ মানুষের নীরব কাতারে দাঁড়িয়ে।


জীবন সম্বন্ধে, বিশেষত নিজের জীবন সম্বন্ধে শৈল্পিক নিয়তির অনুভব, আত্মচিহ্নায়নের বিকাশ, শাশ্বত সামষ্টিক সম্পর্কসূত্র-অন্বেষা আর মগ্নচৈতন্যের অভিকেন্দ্রিকতাকে আবিষ্কারের মধ্যেই আবুল হাসানের কবিতা-সৃজন-বেদনা আলোর পথে রাখে পদচিহ্ন। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতায় দার্শনিকতার নিবিড় স্থাপনা পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি হয়ে ওঠেন আত্ম-বিবরণের কবি, ক্রমাগত এগোতে থাকেন নিজের ভেতরকে প্রকাশ করার আর পারিপার্শ্বকে নিজ-পরিচয়ে তুলে আনার আপ্রাণ প্রচেষ্টায়।

আবুল হাসান দেখেছেন, প্রকৃতঅর্থে, আমরা ভালো থাকি না; ভান করি মাত্র। অন্ধকারে আলো কুড়াতে-থাকা মগ্ন মানুষ কি সত্যিই বলতে পারে সে ভালো আছে? না, পারে না। সভ্যতার অগ্রগমনে মানুষের পায়ের আওয়াজ আর পানিপতনের শব্দে সৃজনশীলব্যক্তি সঞ্চয় করেন সবুজাভ শক্তি। বেদনা আর ভালোবাসার ভাষা খুঁজতে-থাকা কবি হাসান যেন অজান্তে বুকের ভেতর গড়ে তোলেন অরভরা উপন্যাসের জরা-পাহাড়। একসময় তাঁর কণ্ঠ শোককাতর হয়ে ওঠে। তিনি স্বাধীনতার পতাকায় দেখতে থাকেন চেনা মানুষের মুখ, মুখের

প্রতীক আপনজন হারানোর যন্ত্রণা-আভাস : তবে কি আমার ভাই আজ/ঐ স্বাধীন পতাকা?/তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদীতে উৎসব?’ (উচ্চারণগুলি শোকের) শিল্পের প্রতি, তার লাবণ্য আর প্রসন্নতার প্রতি দারুণ আস্থাশীল কবি আবুল হাসান। সকালবেলার রোদমাখা প্রিয়ার নরম হাত, তার লজ্জানত মুখ, চুল থেকে ভেসে আসা সুগন্ধী বাতাস আর মনের কোণে লুকিয়ে-থাকা ইচ্ছাগুলোকে তিনি শিল্পের তাজা জলে ভিজিয়ে নিতে চান।


অবশ্য তিনি ‘প্রত্যাবর্তনের সময়’ দেখেছেন, আলোকসভা নির্মাণ করতে পারে এমন মানুষ আজ বিরল। গড়িয়েছে ব্যাপক সময়, বিগত হয়েছে অগণন মানুষÑ মানুষের কীর্তি-অকীর্তি; রেখে গেছে ‘শিল্পমোড়কে’ অনেক অনেক ‘সুবিধাবাদ’। ব্যক্তিস্বাধীনতা, অস্তিত্ববাদ, অভিব্যক্তিবাদ-কেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশে মানুষ ক্রমাগত হয়ে পড়েছে আত্মকেন্দ্রিক। গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ভিত্তিক চেতনাবলয় ছেড়ে স্বতন্ত্র-ব্যক্তিনির্ভরতা।


একদিকে যেমন অর্জন করেছে প্রাতিস্বিকতার স্বীকৃতি, অন্য দিকে হারিয়েছে দলগতভাবে অবস্থানের সুবিধাদি। একসময়, নগরসভ্যতার উদ্ভব-পর্বে কৃষিনির্ভরতা ছেড়ে গাঁয়ের কর্ষণজীবী মানুষ আকর্ষণমুখী জীবনের প্রতি ঝুঁকে, দিয়েছিল আত্মাহুতি অজান্তেই। অতঃপর আধিপত্যবাদ-আগ্রাসী চিন্তা প্রভৃতির মোহজাল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সচেতন-আধুনিক মানুষ পুনরায় আটকে পড়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা নামক অন্য এক ব্যাধিতে।

কবি এক চিরন্তন মানবিক কান্নায় বিনম্র থাকেন। যেন মাটির ভিতরে সুগোপনে একটি স্বদেশ রেখে, বৃ রেখে, বীজ রেখে, অদেখা কোনো শিকড় যার কোনো শিকড়ত্বই নেই, তার জন্য কাঁদেন তিনি। আর বুকের ভিতর দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রাখার প্রত্যয়ে স্থিত থাকেন। দেশমাতার প্রতি তাঁর প্রাণখোলা আহ্বান : ‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!/... সবুজ দীঘির ঘন শিহরণ? হলুদ শটির বন? রমণীর রোদে/দেয়া শাড়ি? তুমি কি দ্যাখোনি আমাদের/আত্মাহুতি দানের যোগ্য কাল! তুমি কি পাওনি টের/আমাদের য়ে যাওয়া চোখের কোণায় তুমি কি বোঝোনি আমাদের/ হারানোর, সব হারানোর দুঃখÑ শোক? তুমি কি শোনোনি ভালোবাসা/আজও দুঃখ পেয়ে বলে, ভালো আছো হে দুরাশা, হে নীল আশা?’ (উদিত দুঃখের দেশ)


হুমায়ুন আজাদ রাজনীতি সচেতন কবি। রঙিন চশমায় দেখা রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল প্রখর। সুবিধাবাদিতার প্রতিকূলে তাঁর ভাবনার স্রোত প্রবাহিত। তিনি নির্মাণ শান্ত রাজনীতি-প্রবণ রাজ্য আর জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করার প;ে রঙে রঙে সাজাতে চেয়েছেন মানুষের জীবনের অলিগলি।

বহুমাত্রিক-প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ বিশেষত পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছেন প্রাবন্ধিক-ভাষাবিজ্ঞানী-ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে কবিতাচর্চায়ও রয়েছে তাঁর ব্যাপক সাফল্য। চলমান সমাজ পরিপ্রেতি, রাষ্ট্রনীতি, সভ্যতার বিবর্তন মূল্যবোধের ব্যাপক বিকৃতি, মানব-প্রবৃত্তি; আর নিজভাবনার উদার-সরল প্রকাশভঙ্গি তাঁর কবিতানির্মিতির ভেতর-কথা।

‘এখন বাংলাদেশে সব বাঙালিই আপাদমস্তক পঙ্গু’ এই উপলব্ধি মনে লালন করে আটপ্রহর যাতনা অনুভব করেন যে হুমায়ুন আজাদ, তিনি ‘সরষে খেতের হলুদ বন্যার মধ্যে এক বিকেলবেলায়’ সামান্য ভালোলাগার যে অনুভব সন্ধ্যে আসার আগেই বয়ে এনেছিল বিরোধের বিষ, তার বিভ্রম থেকে বেরুতে না-পারার কাতরতায় কাতরাতে কাতরাতে কবি আবর্জনা-অর্থনীতি-পরিচ্ছদ-রক্তনালিতে রঙের গহনপোচ সাজিয়ে তোলেন।

জলপাইয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে না চাইলেও হুমায়ুন চান পৃথিবী থেকে জলপাইরঙের পোশাক বিদূরিত হোক; কেননা দুনিয়ায় তিনি গড়তে চান ‘রঙিন বেহেশ্ত্’। ‘রঙচটা শালিখের পিছে ছুটে ছুটে’ আর কত দিন পথ-চলা যায়! রঙধনুর আসা-যাওয়া কিংবা চাঁদের রঙকে স্থায়ীভাবে ধরতে চান তিনি; বাংলাদেশের জমিতে প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে পথিকের রক্ত; বীজ বুনতে-থাকা কৃষক, শিশু, শিার্থী, যুবক, রিকশাওয়ালা আর পদ্মানদীর মাঝি অপার নিসর্গে উগড়ে ফেলে রক্তকণা।

শাদা বোতলে রাখা লাল রক্ত ঘোলা হতে থাকে দিন দিন; বাড়তে থাকে বেদনার ভার। হুমায়ুনের উপলব্ধি : ‘বাঙলার মাটির মতো বাডব্যাংক আর নেই/একবিন্দু লাল রক্ত/ দশবিন্দু হয়ে যায় সেই ব্যাংকে রাখার সাথেই’।


নারীর কপালে ‘লাল টিপ’ আর ‘একোরিয়ামে পোষা লালা মাছ’ কিংবা বাধা সৃষ্টিকারী সড়কের মাঝে মাঝে দুলতে-থাকা ‘লাল সিগনাল’ যেন খাবলে খায় গতরের ‘লাল মাংস’; সবদিকে ‘সর্বনাশী লাল’ ভয়ঙ্কর কোলাহলে ‘কোমরে সোনালি সাপ লাল মাছ পদ্মার ইলিশ/নিবিড় মৌমাছিপুঞ্জ গড়ে মৌচাক’ এ দেশের প্রান্তে প্রান্তে, ফসলের খোলা মাঠে, কোটি মানুষের স্বপ্নের সংসারে প্রসারিত দুটি ‘শীর্ণ লাল’ নিজবাহু দুচোখে অপলক দেখেন কবি;


ভাবেন প্রসন্ন প্রহর আর কতদূর : ‘আমার দু-বাহু শীর্ণ তবু কারো কারো কাছে সোনালি সুন্দর/তারা আসে আসবেই/তারা গলে গলবেই/ ছড়িয়ে দিয়েছি দুই শীর্ণ জীর্ণ লাল বাহু/রাজপথ কানাগলি ভাঙাচোরা রাস্তায়/ ধরা দাও ধরা দাও যাদের বুকের মধ্যে/গাঢ় লাল পতাকা উড়ছে।’ (বাহু) নন-পোশাকি ফরমেটে কবিতা লিখেছেন রফিক আজাদ। ঔদ্ধত্যপূর্ণ উচ্চারণ রফিক আজাদের কবিতার একটি স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। সমকালে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি কারি কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা’ প্রকাশিত হয়েছে মানুষের পেট ও মনের যাতনা মোচনের বিকট উচ্চারণ। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে সহসা দুর্ভিক্ষের শিকার হাজার হাজার মানুষের দিশেহারা মনের আকুতির প্রতিচ্ছবি এই কবিতা।

কবি লিখছেন : ‘আমার সামান্য দাবি : পড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর/ভাত চাই এই চাওয়া সরাসরি ঠাণ্ডা বা গরম,/সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে/ কোনো ক্ষতি নেই মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই :/ দু’বেলা দু’মুঠো হ’লে ছেড়ে দেবো অন্যসব দাবি।... ভাত দে হারামজাদা, তা না হ’লে মানচিত্র খাবো।’ ব্যক্তির পরাজয় থেকে রাষ্ট্রভূমির ক্রমপতনের আখ্যান বর্ণনা করতে গিয়ে রফিক আজাদ নির্মাণ করেছেন স্বাধীনতার স্বাদ ও স্বস্তির বিপরীতে বিপুল বিপন্নতা। মূলত শিল্প-শুভবোধ আর মানবিক মূল্যবোধই যে কবিতার আরাধ্য, স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে রফিক আজাদ সে কথাই তাঁর পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন।

কবিতার সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা বোধহয় স্পষ্ট এবং স্বীকৃত। দেশ-কালের সঙ্কটে কবিরা সর্বদাই সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকেন। এ দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট মানবতাকে বিপর্যস্ত করেছে বারবার। আর তাই সচেতন কবিকেও থাকতে হয়েছে সদা সতর্ক। স্বাধীনতা-পরবর্তী ‘বাংলাদেশে এই দাবি অধিকতর তীব্র হওয়ায় কবিদের ওপর যে-গুরুভার অর্পিত হয়েছে তার বোঝা কাঁধে নিতে যে কজন কবি সামনের কাতারে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।’


সত্তরের কবিদের মধ্যে নিঃসন্দেহে রুদ্রের কবিতাই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় কবিতামঞ্চে, পাঠকের কণ্ঠে। রুদ্রর বিশেষত্ব এখানে যে, তিনি খুব দ্রুত জনতার কবি হয়ে উঠতে পেরেছেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নষ্টামি, আর যাবতীয় প্রতারণা-প্রবণতার বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ছিল সক্রিয়। কবি একাত্তরের স্বাধীনতার স্বাদ ও মর্যাদাকে বিপর্যস্ত হতে দেখেছেন। সেই পুরনো শকুনেরা পুনরায় জাতিসত্তাকে খামছে ছিঁড়ে ফেলতে শুরু করেছে তা তিনি অনুভব করেন প্রাতিস্বিক-বোধে।

তাই রুদ্র লেখেন ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই। আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে।... ‘রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে,/সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা/ স্বাধীনতা সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন/স্বাধীনতা সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল/ ধর্ষিতা বোনের শাড়ি এ আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা’ (বাতাসে লাশের গন্ধ)। কবির এ বোধ বাঙালি জাতিকে এক প্রবল প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

কবিতায় বিজয় কিংবা বিজয়ের কবিতা যেভাবেই বলি না কেনো, শিল্পিত উচ্চারণে ও বর্ণিল শোভায় বাংলাদেশের কবিতা আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে নিপুণ শক্তিতে। কালের পরিক্রমায় ১৯৭১ সালের যে মহিমা, তার সামর্থ্য ও সৌন্দর্যকে কবিরা অনুভব করেছেন আপন আপন বোধ ও প্রতিভার আলোয়।

 

ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এএসটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।