‘রুম পার্টি’তে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের ধর্ষণ নাকি সমঝোতা!


Published: 2017-05-09 12:34:32 BdST, Updated: 2017-09-21 12:46:11 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : জন্মদিনের কথা বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে। এরই মাঝে প্রশ্নও উঠেছে এটা ধর্ষণ নাকি সমঝোতার মাধ্যমে হয়েছে। অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকায় এনিয়ে নানা প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তারা ওই ঘটনায় ভয় পাচ্ছেন কিনা এনিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

অভিযুক্ত পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেদিন রাতে যা হয়েছে তা সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে। সেখানে ধর্ষণের কোন ঘটনা ঘটেনি। ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে নমনীয় ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অব্যাহত হুমকির মুখে তাদের এই অবস্থান কিনা তাও স্পষ্ট নয়।

জানা গেছে, রাজধানীর বনানীতে ধর্ষিত দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে গভীর রাতে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে ‘রুম পার্টি’তে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। গভীর রাতের ওই বিশেষ পার্টিতেই তাদের সর্বনাশ হয়। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাতভর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর।

ঘটনার পর সামাজিক মর্যাদার ভয়ে তারা দীর্ঘ সময় মুখ খোলেননি। তবে ধর্ষণকারীদের অব্যাহত হুমকির মুখে তারা বাধ্য হয়ে থানায় প্রথমে অভিযোগ পরে মামলা করেন।

তবে ঘটনার এতদিন পর ধর্ষণের অভিযোগ মানতে নারাজ অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, বিশেষ উদ্দেশ্যে ধর্ষণ মামলাটি করা হয়েছে। অভিযোগকারী তরুণীরা স্বেচ্ছায় গভীর রাতে সেই হোটেলে যান। সেখানে অনৈতিক ‘কোনো কিছু’ হয়ে থাকলে তা ছেলেমেয়ে উভয়ের সম্মতিতেই হয়েছে। সেখানে ধর্ষণের অভিযোগ সঠিক নয়।

অভিযোগের বিষয়ে একটি সংবাদ মাধ্যমে নাঈম আশরাফ জানান, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় তিনি মিডিয়ার সামনে আসছেন না। তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। সেদিন রাতে যা কিছু হয়েছে তার সবকিছু সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে।

ধর্ষণের অভিযোগকারী দুই ছাত্রী রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এদের একজন নিকেতন আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে মেসে থাকেন। নিকেতন এলাকাতেই আরেকজন ভাড়া থাকেন তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

উভয় পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বেশি নাড়াচাড়া করতে চান না। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন সংবাদ মাধ্যমে।

এক তরুণীর মা জানান, তার মেয়ে ঘটনার দিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি জানতেন না। ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, মার্চের কোনো একদিন সে আমাকে এসে জানাল, তার এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি আছে। সেখানে দাওয়াত খেতে যাবে। রাতে নাও ফিরতে পারে। পরদিন ভোরে আমার মেয়ে বাসায় আসে। ধর্ষণের বিষয়ে সে জানায়নি।

আরেক তরুণীর মা বনানী থানায় মামলা দায়েরের পর ঢাকায় এসেছেন। একটি সংবাদ মাধ্যমে তিনি বলেন, ধর্ষণ মামলার বিষয়ে আমার মেয়ে আমাকে কিছুই জানায়নি। সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে।

প্রভাবশালীদের কোনো পক্ষের চাপের কারণে আপনারা ভীত কিনা জানতে চাইলে এক তরুণীর মা সংবাদ মাধ্যমে বলেন, আমরা সাধারণ ফ্যামিলি। মেয়েটার বিয়েশাদি দিতে হবে। তাই এখন এমন কিছু বলব না যাতে আমরা আরও বিপদে পড়ি।

অপর মেয়ের মা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। যদি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে তবে আমরা ন্যায্য বিচার চাই। তবে অযথা কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়।

এদিকে ধর্ষণের এ অভিযোগ মোটেও আমলে নিতে রাজি নন আসামিদের পরিবারের সদস্যরা। এক নম্বর আসামি জুয়েলারি ব্যবসায়ী দিলদার আহমেদ সেলিম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তার ছেলে নিরপরাধ। ছেলেকে ব্ল্যাকমেইল করতে ধর্ষণ মামলা করা হয়েছে।

২৮ মার্চ আসলে কী ঘটেছিল- এমন প্রশ্নের উত্তরে দিলদার আহমেদ বলেন, সেদিন সাফাতের জন্মদিন ছিল। রেইনট্রি হোটেলটি আমাদের পরিচিত। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে তার জন্মদিন উদযাপনের কথা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পার্টিতে তার বান্ধবীরা যোগ দিয়ে থাকতে পারে। সেখানে বান্ধবীদের সঙ্গে যদি কিছু হয় তবে তা নিশ্চয় সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে। ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি বলেন, তার ছেলে ঢাকার নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া শেষ করেছে। কিন্তু ২ বছর আগে তার জীবনে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পিয়াসা নামে এক টিভি মডেলের সঙ্গে সাফাতের প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এ সম্পর্কের কথা তারা কেউ জানতেন না। পরিবারের সদস্যদের কাছে গোপন রেখে তার ছেলে পিয়াসাকে বিয়েও করে। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ে মেনে না নিলে সাফাত দুই মাস আগে পিয়াসাকে তালাক দেয়। পিয়াসার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর থেকেই মূলত তার ছেলেকে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চলছে।

বনানী থানায় ধর্ষণের অভিযোগ দেয়ার সময় পিয়াসা নিজেই থানায় উপস্থিত ছিল। তাছাড়া মামলা দায়েরের পর অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পিয়াসা তার মোবাইল ফোনে মেসেজও পাঠিয়েছে। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।

এজাহারে সেই রাতের ঘটনা : মামলার এজাহারে বাদী বলেন, ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরদিন ২৯ মার্চ সকাল ১০টা পর্যন্ত তার এক বান্ধবী ও দুই ছেলে বন্ধুকে গুলশানের রেইনট্রি নামের একটি হোটেলে অস্ত্রের মুখে আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে তাকে ও তার বান্ধবীকে আসামিরা জোর করে হোটেলের রুমে নিয়ে যায়।

সেখানে তাদের মদ পান করানোর পর এক নম্বর আসামি সাফাত আহমেদ তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা অপর বান্ধবীকেও একাধিকবার ধর্ষণ করে দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফ।

এজাহারে আরও বলা হয়, তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিফকে তারা গত ২ বছর ধরে চিনতেন। তার মাধ্যমেই এক ও দুই নম্বর আসামির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ২৮ মার্চ এক নম্বর আসামির জন্মদিন উপলক্ষে সাদমান সাকিফ তাদের দাওয়াত দেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য তাদের কাছে গাড়ি চালক বিল্লাল ও বডিগার্ড পাঠানো হয়। ওই গাড়িতে তারা গুলশানের রেইনট্রি হোটেলে যান।

অনুষ্ঠান সম্পর্কে তাদের বলা হয়েছিল হোটেলের ছাদে অনেক বড় অনুষ্ঠান হবে। সেখানে অনেক লোকজন থাকবে। কিন্তু তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিন্ন দৃশ্য দেখেন। তারা সেখানে রুম পার্টির আয়োজন দেখতে পান। তাছাড়া হোটেলে গিয়ে তারা আরও দুই তরুণীকে দেখতে পান।

এজাহারে বলা হয়, ওই দুই ছাত্রীকে নিয়ে সাফাত ও নাঈম বার বার হোটেলের ছাদ থেকে নিচে নামিয়ে যাচ্ছিলেন। এসব দেখে অনুষ্ঠানের পরিস্থিতি ভালো মনে হয়নি তাদের।

একপর্যায়ে সেখান থেকে তারা চলে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। এতে আসামিরা তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। আসামি সাফাত ও নাঈম তাদের ওপর অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। তাদের বেদম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে দুই তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে আসামিরা। শুধু তাই নয়। ধর্ষণের সময় এক নম্বর আসামি সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লালকে দিয়ে ঘটনার ভিডি চিত্র ধারণ করা হয়।

হোটেলে নির্যাতিত হওয়ার পর ঘটনা গোপন রাখার জন্য তাদের ওপর চাপ দেয়া হয়। বিশেষ করে সাফাত তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী পাঠিয়ে তাদের নানা ধরনের ভয়ভীতির মধ্যে রাখে। এ কারণে তাদের মামলা করতে দেরি হয়।

 

ঢাকা, ০৯ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।