“বঙ্গবন্ধু নামের মহাকাল ও ১টি ভুয়া জন্মদিন”


Published: 2017-08-17 20:37:36 BdST, Updated: 2017-09-23 06:17:39 BdST


১৯২০ এর ১৭ মার্চ থেকে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট। সময়টা অনেক স্বল্প মনে হলেও এর বিশলতা মহাসমুদ্রের মতো গভীর। কারণ? সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, বাঙ্গালি জাতির মুক্তির জন্য একমাত্র পথপ্রদর্শক, জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব শুধু একটি নাম না, শেখ মুজিব মানে একটি জাতি, একটি দেশ, একটি ইতিহাস, একটি মহাকাল।

শেখ মুজিবুর রহমান থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু এবং তারপরে জাতির পিতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে হাজারো প্রচেষ্টা, হাজারো আন্দোলন সংগ্রাম। যেহেতু এই বিষয়টা মোটামুটি বর্তমানে জাতির কাছে অনেকটাই পরিষ্কার আছে তাই আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বলে আমার মূল বিষয়ের দিকে যেতে চাচ্ছি।

বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ বলতেই হবে। কারণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যতগুলো আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলিতেই প্রত্যক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জড়িত। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি  ভাষা আন্দোলনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু ১৪ ফেব্রুয়ারি কারাগারে থেকেই অনশন শুরু করেন। তারই ফলাফল ভাষা আন্দোলনে রূপ নেই। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব, যেটিকে বাঙ্গালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালি জাতিকে মুক্তির জন্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য আহ্ববান করেন, যেটিই প্রকৃতপক্ষে এদেশের নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য একমাত্র অনুপ্রেরণা হয়েছিল। সবশেষে ২৫ মার্চ রাত্রি ১২ টা ২০ মিনিটে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পাড়ার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ঠিক এই ঘোষণার পরেই সেদিন রাত ১ টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এই ঘোষণাই বয়ে এনেছে বাঙ্গালি জাতির সেই মহাপ্রাপ্তি, কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তৈরী হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু মার্চ ১৯৭৪ এ বলেছেন, "আন্দোলন গাছের ফল নয়।আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নি:স্বার্থ কর্মী হতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার"। বাঙ্গালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তিনি আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেছেন ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই। প্রতিবাদি কন্ঠের কারণে ১৯৩৮ সালে স্কুল জীবনেই কারাগারে যেতে হয়েছিল ছোট্ট মুজিবকে। স্কুল জীবনে প্রথম জেলে গিয়ে কাটিয়েছেন ৭ দিন কারাজীবন। তারপরে ১৯৪৮ এর মার্চ ও সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯ এর জানুয়ারি, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর, ১৯৫০, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৫ সাল সহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের জন্য কারাগারে জীবন কাটাতে হয়েছে মোট ২৩ বারে ৪৬৮২ দিন। তারপরেও থেমে ছিলেন না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করার পর বাঙ্গালি জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন তার স্বপ্নের এক সোনার বাংলা গড়তে। তারই ধারাবাহিকতাই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু আমরা বেইমানের জাত, মীরজাফরের বংশ, হায়নার জাত বলে সেই স্বপ্ন আজো বাস্তবে রূপ দিতে পারিনি। সেই স্বপ্নটাকে চিরতরে নিভিয়ে দেওয়ার জন্যই সেদিন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, রাত্রের শেষ প্রহরে হায়নার দল পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো তাদের সকলের অন্নদাতা, জাতিকে মুক্ত করা সেই মহান নেতা, বঙ্গবন্ধুর বুকের উপর। একটুও মায়া হয়নি সেদিন ওই নরপিচাশদের। একে একে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সকলকে(শুধু বঙ্গবন্ধু কণ্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় ওদের হাত থেকে বেঁচে যান)। সেদিন ওরা নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকেও বেঁচে থাকতে দেয়নি এই পৃথিবীতে।

বঙ্গবন্ধু নামের মহাকাব্যকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল সেদিন ওই বেঈমানের বংশধররা। কিন্তু না, ওরা সেটা পারিনি। বঙ্গবন্ধুকে সেদিন হত্যা করলেও এদেশ থেকে হত্যা করতে পারিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে। লক্ষ লক্ষ মুজীব সেনার জন্ম হয়েছে এই বাংলায়। যারা আজ বঙ্গবন্ধুকণ্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে।

কিন্তু ঘৃণ্যা হয় যখন শুনি ও নিউজে দেখি আজও সেই মিরজাফরের বংশধররা অস্বীকার করতে চেস্টা করে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে। যখন অস্বীকার করে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাকে। যখন শোকাহত এই দিনটিকে রঙ্গমঞ্চ তৈরি করতে চাই। খুব কস্ট হয় যখন শুনি দেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইতিহাসের এই কালো দিন ১৫ আগস্টে ভূয়া জন্মদিন তৈরী করে তা ঘটা করে পালন করেন। এ বছর তিনি নাকি জন্মদিনের কেক কাটেননি। প্রথমে মনে হয়েছিল খুব প্রশংসা করার মতো কাজ করেছেন উনি। কিন্তু অবাক হয়েছি যখন টিভি নিউজে দেখলাম বিএনপির বড় বড় নেতারা গলা ফাটিয়ে বলছে এ বছর দেশের বন্যা পরিস্থিতি খারাপ থাকার কারণে নাকি তারা জন্মদিন পালন করেননি। অর্থাৎ দেশে যদি অনুকূল পরিবেশ থাকতো তাহলে ওরা আবারো ১৫ আগস্ট ভূয়া জন্মদিনের কেক কাটতো। তারমানে কি জাতির পিতাকে অবমাননা করা হয়না? জাতির পিতার হত্যাকান্ডকে অস্বীকার করা হয়না? সেদিনের হত্যাকান্ডকে সাপোর্ট দেয়া হয়না? কি হবে এই জন্মদিনের কেকটা কেটে? কি মজা পান আপনারা এই শোকাহত দিনটাকে আনন্দময় করে তুলে?

আপনারা কি জানেননা যে এই দিনে কত কোটি মানুষ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে মুজিবকে স্বরণ করে বুকের কলিজাফাটা আর্তনাদ করে থাকে? আপনারা কি জানেননা আজো কতো মা, কতো বোন, কতো বাবা, কতো ভাই, কতো ছাত্রজনতা যদি রাত পোহালে শোনা যেতো বঙ্গবন্ধু মরেনাই গানটি শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলে?

তাহলে এই জাতিকে বেঈমানের জাতি বলবোনা কেনো? আমাদের মাঝে এখনো অসংখ্য বেঈমান বসবাস করে যাচ্ছেন যাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে শাস্তির ব্যাবস্থা করা উচিত।

তাই আজ বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু হারানোর শোককে শক্তিতে পরিনত করতে হলে বঙ্গবন্ধুকে শুধু শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করলেই হবেনা, যারা বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করে তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তির ব্যাবস্থা করতে হবে, আবারো জেগে উঠতে হবে এদেশের মানুষকে। বঙ্গবন্ধু যেভাবে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিবাদ করে গেছেন নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে, ঠিক তেমনি আমাদেরও যৌক্তিক প্রতিবাদ করে যেতে হবে এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। তা না হলে এই বেঈমানেরা হয়তো আবারো একটা ৭৫ এর জন্ম দিতে পারে এ বাংলায়।

 

মোঃ সোলাইমান হোসাইন, অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর,

হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

 

ঢাকা, ১৭ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।