বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০১৭: আমাদের অঙ্গীকার


Published: 2017-10-19 16:34:40 BdST, Updated: 2017-11-20 19:18:40 BdST

রিয়াজুল হাসান: সারা পৃথিবীতে সবার জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের রূপকার হিসেবে শিক্ষকদের অবদান স্মরণ করার জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে থাকে। সেই সাথে, এ বছর উচ্চশিক্ষার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইউনেস্কো কর্তৃক সুপারিশমালা প্রনয়নের ২০ বছর পূর্তি উৎসব পালিত হতে যাচ্ছে। সেজন্য, ইউনেস্কো বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘স্বাধীনভাবে পাঠদান, শিক্ষক হবেন ক্ষমতাবান’!

এদিকে, নোবেল শান্তি বিজয়ী কৈলাস সত্যার্থী গত ২ এপ্রিল ঢাকায় 'দশ কোটি শিক্ষা বঞ্চিত মানুষের জন্য আমরা দশ কোটি, আমাদের ভবিষ্যৎ আমরাই গড়বো' শীর্ষক এক শপথ ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেন। এটি নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সাক্ষরসমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে গণসাক্ষরতা অভিযান, বাংলাদেশ। তারা সকল সহযোগী সংগঠন নিয়ে ৫ অক্টোবর ২০১৭ বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে এই 'শপথ' বাক্য পাঠ করানোর উদ্যোগ গ্ৰহন করেছে।

এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কোর মহাসচিব ইরিনা বোকোভা তাঁর বাণীতে বলেন, দেশে দেশে একাডেমিক স্বাধীনতা ও শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসন হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে। তিনি উদাহরন দিয়েছেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কঠিন বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে স্টান্ডার্ড পরীক্ষা নেওয়া হয়। সামগ্রিক শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্নমুখী চাহিদা উপেক্ষা করে শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকেরা তাদের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার সকল স্তরেই একাডেমিক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ ও গবেষণা কাজে মনোনিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে ও স্বল্প বেতনে নিয়োজিত হন। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন। তাদের ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা নষ্ট হয়। অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ আর স্বল্প বেতন, সব মিলিয়ে তাদের একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়। পরিণামে ক্ষতিগ্ৰস্থ হয় গুণগত শিক্ষা।

বোকোভা লক্ষ্য করেছেন, শিক্ষকেরা রাজনৈতিক চাপ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে স্বাধীনভাবে পাঠদান করতে পারছেন না। বিভিন্ন দেশে ও কমিউনিটিতে কর্মরত শিক্ষকেরা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল, অসহনশীল ও বৈষম্যমূলক পরিবেশে কঠিন বাধা মোকাবেলা করে গবেষণা ও পাঠদান করে যাচ্ছেন।

এবছর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল-এর উপ-সাধারণ সম্পাদক ডেভিড এডওয়ার্ড ইউনেস্কো সদরদপ্তরে বলেন, উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব, একাডেমিক যোগ্যতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা থেকে নিয়োগকারী ও বিনিয়োগকারীরা 'শিক্ষকদের স্বাধীনতা'কে মুক্তি দিয়েছেন। অন্যদিকে আরেকদল লোক বিভিন্ন দেশের সরকারকে বোঝাচ্ছেন, শিখন-শেখানো কার্যক্রম আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে প্রাইভেট কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয় করা যেতে পারে। যেখানে শুধু কম্পিউটার অ্যাপসের মাধ্যমে সস্তায় শিক্ষাদান করা সম্ভব হবে। সেই শিক্ষায় প্রয়োজন হবেনা কোন পেশাদারিত্বের। দরকার হবে না কোন বিশেষায়িত পাঠক্রমের। সেখানে সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংযুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তাও থাকবে না।

এবছর গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনিয়মিত শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অধ্যাপকের মাত্র এক–চতুর্থাংশ সরকারি অনুদান লাভ করেন। বাকি অধিকাংশকেই কোনো বাসায় নয়, গাড়িতে রাত্রি যাপন করতে হয়। সে দেশে উচ্চ শিক্ষায় নিয়োজিত ৭৫% শিক্ষক ট্যানিউর বহির্ভূত। দক্ষিণ আমেরিকায় এই হার ৮০%, অস্ট্রেলিয়ায় ৪০% এবং কানাডায় ৩০% ভাগ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এসব অনিয়মিত শিক্ষকের একাডেমিক স্বাধীনতা অত্যন্ত ভঙ্গুর। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঐ সকল ক্যাম্পাসে অল্প বেতনে শিক্ষক নিয়োগের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসকল কর্পোরেট ক্যাম্পাসে শ্রম আইন মানা হচ্ছেনা। অনেক ক্ষেত্রে অধ্যাপকদের প্রতি শ্রমিকের মতো আচরন করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা ডরমেটরিতে একটি কক্ষে ৫/৬ জন একত্রে বসবাস করছেন।

এ ধরনের বৈষম্যের কারণে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একাডেমিক ব্যক্তিবর্গ ও গবেষকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, শিক্ষার্থীরাও পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। কানাডা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এক গবেষণায় দেখিয়েছে, অনিয়মিত অধ্যাপকেরা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও গবেষণা কাজে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেকটাই অপারগ। আয়ের জন্য দীর্ঘসময় ধরে কাজ করে, এবং কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে নিয়োজিত থাকার কারণে তারা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না। চাকুরির নিম্ন মর্যাদার কারণে তারা এমনকি কোনো শিক্ষার্থীকে সুপারিশ পত্র বা কাউকে গবেষণা রিপোর্টের ডিফেন্স পর্যায়ে সহযোগিতা করতে পারেন না।

১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো/আইএলও কর্তৃক প্রণীত সুপারিশমালায় দেখা যায়, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার ক্ষেত্রে নিয়োগ পর্যায়ে পেশাদারিত্বের মান বজায় রাখার জন্য শিক্ষকদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষকদের এই পেশাগত স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন না থাকার কারণে অনেক দেশে সরকারগুলো মানহীন শিক্ষক দিয়ে স্বল্প খরচে শিশুদের লেখাপড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যার দরুন এই সব শিক্ষার্থীরা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পাড়ছে না।
একাডেমিক ও পেশাগত স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা শ্রম অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এ বছর অগণতান্ত্রিক সরকারের সমালোচনার কারণে বিভিন্ন দেশে অনেক শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল তাদের মুক্তির জন্য বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে।

দেখা গেছে - একজনকে নারীবাদী বক্তব্য দেওয়ার জন্য, আরেকজনকে আধা সামরিক বাহিনীর উপর গবেষণা করার জন্য, এবং অপরজনকে একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির উৎপাদিত ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি জানা গেছে, একটি দেশে বিবর্তনবাদ বিষয়ে পড়ানোর জন্য ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে শিক্ষকদেরকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতা হচ্ছে। তবে শিক্ষাই হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য প্রদানকারী বিষয়। শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবতাকে সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু প্রযুক্তির বিপুল বিকাশের এই যুগে মিথ্যার সাথে সত্যকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং বাস্তব ঘটনার সাথে ব্যক্তিগত মতামতকে মিশিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে যৌক্তিক সন্দেহের জায়গা দখল করেছে অসূয়া প্রবনতা (cynicism)। সাধারণ মানুষেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রচারে এখন অনেকটাই বিভ্রান্ত। তবে শিক্ষকেরাই পারেন এই সর্বগ্ৰাসী অসুস্থতা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। শিক্ষকদের কাজকে রোবটের হাতে ছেড়ে না দিয়ে বরং তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যাতে তারা সমালোচনামূলক চিন্তা, নানামুখী জ্ঞান ও ইতিহাসের উপলব্ধি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করতে পারেন।

আমরা জানি, গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে জাতিসংঘভুক্ত ১৯৩ সদস্যদেশ জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০৩০ সালকে সামনে রেখে Transforming Our World: The 2030 Agenda for Sustainable Development শীর্ষক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এখানে আগামী ১৫ বছরে অর্জনযোগ্য ১৭ টি গোল এবং ১৬৯টি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ এবং তৎপরবর্তী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ এর উপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়েছে। ২০৩০ এজেন্ডার ৪র্থ লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য একীভূত এবং সাম্যভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাসহ জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ প্রসার (Ensure inclusive and equitable quality education and promote lifelong learning for all)। আশার কথা, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে পাঠদান করা এবং ক্ষমতায়নের বিষয়টির উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।


লেখক: প্রফেসর ড. এ.কে.এম. রিয়াজুল হাসান
প্রিন্সিপাল, শেরপুর সরকারি কলেজ।

 

ঢাকা, ১৯ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।