পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট না পাওয়া হতভাগাদের গল্প


Published: 2017-09-14 12:31:42 BdST, Updated: 2017-09-21 14:39:42 BdST

জি. এম. শাহিন হোসেন: দেশের স্থায়ী বাসস্থায়ী হয়েও, অস্থায়ী বাসস্থানে এসে উদ্বায়ী শরনার্থী শিবিরের ভাসমান বাসিন্দারুপে পরিগনিত হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

কথাটি কাব্যিকতার ছন্দে ছন্দ মিলানোর জন্য বলিনি, এটা ঘটছে গোপালগঞ্জে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আকর্ষন হলের বাসিন্দা হয়ে থাকার স্বর্ণীল সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই শিক্ষার্থীরা।


আধুনিকতার ছোয়াই ছোট্ট এবং নব্য প্রতিষ্ঠিত একটি শহর গোপালগঞ্জ। শহরের অদূরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই যার একটু একটু করে উন্নত থেকে উন্নীত হওয়া। কিন্তু উন্নতির নিদারুন সেই পথচলাই অবনতির দিকে টানছে শিক্ষার্থীদের জীবনব্যাবস্থা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসাবে কষ্ট করতে হবে, এটা অলীক সত্য, কিন্তু সেটা যদি হয় মৌলিক চাহিদার প্রথম ও প্রধান দু’টি নিয়ামকের অন্তরায়, তবে সেটাও অসমীচিন। এখানে খাদ্য ও বস্ত্রের উপোযোগ যেমন বাড়ছে, নির্ধারিত মূল্যস্ফিতিও তেমনি বাড়ছে, কিন্তু মান বাড়ছে না।


বিশ্ববিদ্যালয় বিস্তৃত হবার সাথে সাথে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী সংখ্যাও বাড়ছে, কিন্তু সেটার সাথে তাল মেলাতে ব্যার্থ হচ্ছে আবাসিকতা। ফলস্বরূপ, প্রচলিত বাসা ভাড়ার থেকেও বেশি খসছে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে। অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এসব শিক্ষার্থীর বর্ধিষ্ণু এই ভাড়ায় ধরাসয় হতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংখ্যার আধিক্যতায় অনেক দূর্ভোগ ও পোহাতে হচ্ছে তাদের,এ যেন টিকে থাকার এক দূর্বার লড়ায়।


খরিদ্দারের সংখ্যা ও দোকানির ব্যবহারের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কের মতই, সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে বাসা মালিক ও শিক্ষার্থীদের। অনেক জায়গাতে বাসার মালিকের মতের সাথে কিঞ্চিৎ মতানৈক্য হলেই বাসা ছাড়ার পয়মান চলে আসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে। নতুন জাইগা, নতুন পরিবেশ, তবুও অবিভাবকত্বহীন্ আচারন মিলে অনেক বাসা মালিকের কাছ থেকে। অসুস্থ থাকলেও আর্থিক, আত্নিক কিংবা দৈহিক, কোনরূপ সহযোগিতার মনোভাব ও থাকেনা অনেকের, আর থাকবেই বা কেন? তারাতো আর মানুষ নয়, তারা ভাড়াটিয়া। অথচ রাস্তার পাশে ক্রন্দনরত পরে থাকা মুমূর্ষ পথশিশুকেও দেখলে বিবেকবান মানুষের হৃদয় কেপে ওঠে, আত্নার শব্দহীন আত্নোচিতকারে! কিন্তু তারা চিনে টাকা, বাসামূল্যের দাম চরমহাতে আদায় করতেও অনেকে অভ্যস্ত, তাইতো দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত অনেক কেই তাদের সেই চরমতার মূল্য পর্যন্ত দিতে হই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শর্তপূরনের মত, অনেক শর্ত পূরন করেই তাদের বাসা নিতে হই, যেমন-১০টার পর গেট বন্ধ, ইচ্ছানুযায়ি চলাফেরা বন্ধ, উচ্চস্বরে কথা বন্ধ,ইত্যাদি। তাইতো নিজের ভাড়া করা বাসাই নজরবন্দি ও পরাধীনতার শিকল পরহিত হয়ে অনাবতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। এসব শোনার পর হইতোবা আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এতসব শর্তারোপের পরে, সেখানে থাকি কেন? কারন, এই শহরের ‘বাসা ভাড়া দেওয়া হইবে’এই পোষ্টার থেকেও ‘পড়াতে চাই’ পোষ্টারটি অধিক এবং দৃষ্টিনন্দন। বাসা ভাড়া দেওয়া হবে পোষ্টার লাগালেই খেল খতম, ফোন কলের জন্য অপেক্ষাও করতে হইনা মালিককে সেটা যত খারাপ বাসাই ই হোক। এ যেন মালিক সমাজের সৌভাগ্যের এক নিদারুন হলি-খেলা।

একটা ছেলের গল্প বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আকাশছোয়া স্বপ্ন নিয়ে যার আগমন, কাশফুলের ক্যাম্পাসে। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা থাকার পরেও হলে সিট মিলল না তার। বাধ্য হয়েই বাইরে বাসস্থানের ব্যাবস্থা করতে হল। শুরুটা স্বাভাবিকতার নিয়োমেই নিয়েছিলো সে, কিন্তু স্বাভাবিকতার মর্মবানিও সময়ের পদাঙ্ক অনুসরন করে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হল। কিছুদিন পরেই হুকুম আসলো মালিক মহাদ্বয়ের (উদ্ধৃতাংশে শরনার্থী শিবিরের বাসিন্দা এই জন্যেই ই বলেছি), বাসা ভাড়া বাড়াতে হবে, তাও একবারেই ই তিন হাজার।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তো তাই, আবারো শরনার্থ হল নিম্নমানের অন্য কোনো শরনার্থীশালায়। কিন্তু সেখানে বাসার মত বাসার মালিকিনির ব্যবহারও যে নিম্ন মানের সে সম্পর্কে সে ছিল বেওয়াকেবহাল। তিনার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট, বিনা পয়সাই গ্যান বিতারনের মাধ্যমে সুনিপুন মগজ ধোলায় করতে পারতেন, মেসের কোনটা কিভাবে করতে হবে, সব পরামর্শ স্বেছাই দিতেন তিনি। যেন তিনি ইতোপূর্বে রাষ্ট্রীয় কোনো দপ্তরের দাপ্তরিক পরিকল্পনাবিদ ছিলেন। পরামর্শ দেওয়া খারাপ কিছু নই, তবে পাখিকে আকাশে উড়ার প্রশিক্ষন যদি দেওয়া হই এবং প্রশিক্ষক যদি হই ব্যাঙের মতো উভচর, তাহলে সেটাতো বেমানান রূপের ই পরিচায়ক।

অনেক জায়গায় আবার ফ্লাট অনেক, বৈদ্যতিক মিটার একটা, মালিকের বিদ্যুৎ বিল ও ভাড়াটিয়ারা দিয়ে থাকেন, আরো অনেক কথাই বলার ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ও পারিপার্শিকতায় আমাকে কন্ঠ্রুদ্ধ করে ফেলেছে।


যাই ই হোক ছেলেটির কথা শুনে মনে হল, পড়াশোনার চেয়ে নিদারুন কষ্টের মাঝে কিভাবে টিকে থাকতে হয়, সেই শিক্ষাই শিক্ষিত হতে এখানে এসেছি। এই আসাই লালিত আশা যে ভগাঙ্কুরপ্রায়, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
তবে ,খারাপের পাশাপাশি ভালো থাকবে, সেটা এখানেও বিদ্যমান, কিন্তু স্বাভাবিকতার থেকে একটু কম।


পরিশেষে কাউকে কোন দোষ দিচ্ছিনা, সব কিছু হইতোবা একদিন আশানুরুপ হবে, কিন্তু কবে হবে, সেটা হইতোবা কল্পনাতেই ই রবে।

 

জি এম শাহিন হোসেন,
সি এস ই বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঢাকা, ১৪ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।