বিভ্রান্ত তারুণ্য এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব


Published: 2016-12-08 21:54:33 BdST, Updated: 2017-11-20 21:33:36 BdST




মোহাম্মদ সালেক পারভেজ: গত ১লা জুলাই রাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁতে এমন একটি ঘটনা ঘটে যা যেমন লোমহর্ষক, তেমন নিন্দনীয়। উক্ত ঘটনা এবং সমসাময়িক আরও কিছু ঘটনা -দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ধরণের সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্য হতে একটি বিশেষ চিত্র সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেছে। উহা হচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান যুব সমাজ ক্রমান্বয়ে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে । এখন স্থানে স্থানে সেমিনার-সিম্পজিয়ামের ঢল নেমেছে। সর্বত্রই একই আলোচনা ‘তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে সঠিক পথে রাখা যায় ? তরুণরা কাকে অনুসরণ করবে? আদর্শের সন্ধানে উপরোক্ত জিজ্ঞাসার জবাবে নানা মুনীর নানা মত পাওয়া যাচ্ছে। অনুসরণীয় হিসাবে কেহ ম্যান্দেলা , কেহ ওবামা, কেহ বিল গেটস, কেহ স্তিভ জবস, কেহ বা মহাত্মা গান্ধীর কথা বলছেন। কেহ উপদেশ দিচ্ছেন বেশী বেশী করে খেলাধুলাতে মগ্ন হতে। আবার কেহ কেহ পরামর্শ দেন রবীন্দ্রচর্চা করতে। আমি কোন ধরণের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই বলছি যে এহেন ব্যক্তিবর্গকে অনুসরণ করা অপেক্ষা শেরেবাংলা-সোহরাওয়ারদি-বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করা শতগুণে উত্তম। কিন্তু এই তিনজনও যার অনুসারী হিসাবে পরিচয় দিতে গৌরবান্বিত হতেন, সেই মহান ব্যক্তিত্বের অনুসরণ নিয়েই আমার এই নিবন্ধটি। আর সেই মহান ব্যক্তিটি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

ইহা সত্যি পরম আশ্চর্যের বিষয়, কোন বাঙালী যুবক যখন বলে যে, সে এমন কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না যাকে অনুসরণ করে একটি আদর্শ জীবন গঠন করা যায়। কারণ বাংলা ভাষায় বিশ্বনবী সম্পর্কে জানার জন্য বইপত্রের কোন অভাব নেই। অতএব, উক্ত বক্তব্যের পেছনে ২টো কারণ অনুমান করা যায়। (১) অনেকে অসূয়াশত বিশ্বনবীর নাম ইচ্ছা করেই বলছেন না। (২) বিশ্বনবীর কর্ম ও অবদান সম্বন্ধে অনেকের হয়তো তেমন জানাশুনা নেই। দ্বিতীয় কারণটির প্রচুর সম্ভাবনা আছে। আগে স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে বিশ্বনবীর জীবনের অনেক ঘটনার উল্লেখ ছিল, কিন্তু বর্তমানে দুরভিসন্ধি মূলক ঐ গুলোকে তুলে দেয়া হয়েছে। সুতরাং প্রজন্মের পক্ষে এ জ্ঞান অর্জন দুরূহ হয়ে গেছে যে কেন বিশ্বনবী সকল সময়ের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় –অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব । বিশ্বনবীর বিশেষত্ব বুঝানোর জন্য আমি অতি সংক্ষেপে মাত্র ২টি ঘটনা উল্লেখ করছি।

ঘটনা-১ : বিশ্বনবীর বয়স তখন প্রায় পয়ত্রিশ। মক্কার সকল গোত্র একজোট হয়ে পবিত্র কাবা ঘর পুনঃনির্মাণ করছে। কাজের শেষ পর্যায়ে এসে কালো পাথর বসানোর ইস্যুটি নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ হয়ে গেল। অবস্থা এমন ভয়ংকর রূপ ধারণ করল যে সকলে তরবারি নিয়ে প্রস্তুত, যে কোন মুহূর্তে খুনোখুনি বেঁধে যাবে। এমতাবস্থায় কোন একদিন তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বাদে পরদিন ভোরে সর্বপ্রথমে যে কাবা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হবে তার দেয়া ফয়সালা সবাই মেনে নেবে। অবশিষ্ট ঘটনা পাঠক মাত্রই অবহিত আছেন বিধায় বর্ণনাতে গেলাম না। কিন্তু বিশেষ গুরুত্বের সাথে আমি যেটুকু উল্লেখ করতে চাই উহা এই যে, পরদিন ভোরে তারা যখন দেখল সবার আগে কাবা ঘরে হাযির হওয়া মানুষটি হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ), তখন তারা মনের আবেগে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলে ওঠল, ঐ-তো আমাদের আল-আমীন।

উল্লেখ্য যে, বিশ্বনবীর ঐ ফয়সালাকে তারা এমনভাবে মেনে নিয়েছিল যে, পরবর্তীকালে বিশ্বনবী ইসলাম প্রচার শুরু করলে তারা এই পরিমাণ শত্রুতা করে যে বিশ্বনবীকে হিজরত করতে হয়। কিন্তু একজন লোকও একবারও বলে নি যে, কালো পাথর সংক্রান্ত নবীজীর ফয়সালা পরিবর্তন করা হোক। প্রিয় পাঠক! দুনিয়ার আদ্যোপান্ত ইতিহাস তন্ন তন্ন করে ঘাঁটুন। তারপরে এমন একজন ব্যক্তি কি বের করতে পারবেন যার কোন ফয়সালা একদল রক্তপিপাসু দাঙ্গাবাজ এমন হৃষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছিল?

ঘটনা-২ : এতো সবাই জানে যে মক্কার লোকেরা নবীজীর নিকটে মূল্যবান জিনিসপত্র আমানত রাখত। অথচ এই লোকেরাই কিন্তু দিনরাত বিশ্বনবীর বিরোধিতা করত। হিজরতের সময় বিশ্বনবী হযরত আলীকে এই দায়িত্ব দিয়ে যান যে নবীজীর নিকট গচ্ছিত আমানত সমূহ যেন যথা স্থানে পৌঁছে দেয়। প্রিয় পাঠক! আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ মানব ইতিহাসে দ্বিতীয় একজন ব্যক্তি বের করুন যার নিকটে তার বিরুদ্ধবাদীরাও কোন সাক্ষীসাবুদ ছাড়াই কোন মূল্যবান দ্রব্য আমানত রাখে।

অনুপম সমাজ বিশ্বনবী কোন সমাজে, কাদের নিকটে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছিলেন এবং প্রত্যুত্তরে তারা কেমন ব্যবহার করেছিল ইত্যাদি সমস্ত বিষয়তে ইতিহাসের পাতা পরিপূর্ণ। কিন্তু, বিস্ময়কর যে, মাত্র ২৩ বৎসরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বিশ্বনবীর চরিত্র মাধুর্যে বিমুগ্ধ মানুষ স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল। আরবের সেই ভয়ংকর প্রকৃতির মানুষগুলোকে নিয়ে বিশ্বনবীর দিকনির্দেশনায় নতুন একটি সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি করা হল। কেমন সে সমাজ তৈরি হল ? বুঝতে হলে নিম্নের তুলনামূলক পার্থক্য দেখুন।

প্রাক-ইসলামী যুগ ও ইসলাম পরবর্তী যুগ

(১) প্রাক-ইসলামী যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। ইসলাম পরবর্তী যুগে
কন্যা সন্তানের প্রতিপালন জান্নাত লাভের উসিলা বলে গণ্য হল।
(২) প্রাক-ইসলামী যুগে মদ এবং মাদক দ্রব্যে সমাজ-সংসার ছিল বিপর্যস্ত। ইসলাম পরবর্তী যুগে মদ-মাদকের সকল ধরণের ব্যবহার এবং ব্যবসা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হল।
(৩) প্রাক-ইসলামী যুগে ধর্ষণ-ব্যভিচার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ইসলাম পরবর্তী যুগে
লালসার দৃষ্টিতেও কোন মেয়ের দিকে কেহ তাকাত না।
(৪) প্রাক-ইসলামী যুগে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ইত্যাদির ভয়ে জনগণ ছিল তটস্থ । ইসলাম পরবর্তী যুগে কোটি টাকা নিয়েও একা যে কোন ব্যক্তি দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করত ; কেহ ফিরেও তাকাত না।
(৫) প্রাক-ইসলামী যুগে সমাজের প্রভাবশালীরা ছিল বিচারের উরধদে। ইসলাম পরবর্তী যুগে
বিচারের রায় পক্ষপাতহীন ভাবে আমীর থেকে ফকীর সবার উপরে সমানভাবে কার্যকরী হত।
(৬) প্রাক-ইসলামী যুগে সুদের কারণে ধনী আরো ধনী এবং গরীব আরো গরীব হত। ইসলাম পরবর্তী যুগে সুদ শতভাগ নির্মূল হল। যাকাত-কে প্রাপকের নিকটে কড়ায়-গণ্ডায় পৌঁছান হল। দারিদ্রতা বিদায় নিল।
(৭) প্রাক-ইসলামী যুগে সংখ্যালঘুরা সার্বক্ষণিক উচ্ছেদ আর নিপীড়নের আতঙ্কে ভুগত। ইসলাম পরবর্তী যুগে সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার সমূহকে সংখ্যাগুরু মুসলমানরা ফরজ মনে করে আদায় করে দিত।

প্রিয় পাঠক ! এমন একটি অসাধারণ সমাজ ব্যবস্থা এই ধরায় আর কেহ কোনদিন চালু করতে পেরেছিল কি ?

বিশ্বনবীর সাফল্যের রহস্য বিশ্বনবী কেন সফল হলেন? কেমন করে তিনি পশুর চেয়েও অধম মানুষগুলোকে ফেরেশতার চেয়েও উত্তম বানালেন? বিষয়টি উপলব্ধি করতে হলে এ কথাটি গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, বিশ্বনবী কাজ করেছেন সরাসরি মানুষ নিয়ে, কোন পদ্ধতি বা যন্ত্রের উন্নতি নিয়ে নয়। অর্থাৎ বিশ্বনবী মানুষের মধ্যে ‘মানসিকতা’ নামক যে বিষয়টি আছে সেটিকে যথাযথভাবে পরিমার্জনা-পরিশোধনের মাধ্যমে পরিপুষ্ট করেছেন। সমাজে তখনো ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল সব ধরণের লোক ছিল।

কিন্তু বিশ্বনবীর সংস্পর্শ ধন্য ঐ লোকগুলো এমন ছিল যে ধনীর মনে ধনের অহংকার ছিল না। সে ধনকে মনে করত বিলাসিতার উপকরণ নয়, বরং তার নিজের এবং আর দশ জনের জরুরী প্রয়োজন পূরণের হাতিয়ার। অন্যদিকে দারিদ্রতার কারণে গরীবের মনেও কোন ধরণের হতাশা বা লোভ ভর করত না। সে ভুলেও ধনবানের সহায়সম্পত্তি লুটপাটের চিন্তা করত না।

সম্পদশালীর মনে গেঁথে গিয়েছিল শোকর এবং দায়িত্ববোধের চিন্তা আর গরীবের কাজে-মেজাজে ছিল পরিপূর্ণ ছবর। আবার সবল তার শক্তিকে ব্যয় করত দুর্বলের অধিকার আদায়ের জন্য যার কারণে দুর্বলের মনেও সবলের বিরুদ্ধে কোন ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হত না। সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি নর-নারীর হৃদয়ের গভীরে বিশ্বনবী এ সত্যটি গেঁথে দিতে সমর্থ হন যে জীবনের উদ্দেশ্য কেবল একটিই হতে পারে এবং উহা হল আখেরাতে মুক্তি পাওয়া ; তবে এ মুক্তি এত সহজ নয় বরং অনেক কঠিন এবং সাধনা সাপেক্ষ। ইহাই হল বিশ্বনবীর সাফল্যের অন্তর্নিহিত রহস্য।

চিরন্তন দিকনির্দেশনা:

যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবীর আগমন হবে না, সেহেতু বিশ্বনবী এমন কিছু দিকনির্দেশনা রেখে গেছেন যেগুলো মনে চললে আদর্শ জীবন, আদর্শ সমাজ গঠন করা সবসময়ে সম্ভব। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমি তিরমিজী শরীফ থেকে একটি হাদিস উল্লেখ করছি। “ হাশরের মাঠে কোন ব্যক্তি এক কদমও নড়তে পারবে না যতক্ষণ না সে ৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে: (১) জিন্দেগী কি কাজে ব্যয় করেছে ? (২) যৌবন কিসের পেছনে ব্যয় করেছে ? (৩) ধনসম্পদ কিভাবে অর্জন করেছে ? (৪) ধনসম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে ? (৫) অর্জিত ইলম অনুসারে কতটুকু আমল করেছে ? ” যে ব্যক্তির হৃদয়ে উপরোক্ত হাদিসটি বদ্ধমূল হয়ে যাবে (কেবল মুখস্থ নয় ) তার পক্ষে, জঙ্গিপনা কিংবা সন্ত্রাস তো অনেক দূরের কথা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন অন্যায় করা কি আদৌ সম্ভব ?

উপসংহার:

আসল ব্যাপারটি দিনের আলোর মতই পরিষ্কার। আপনি যদি সত্য গ্রহণে উদারচিত্ত হন, তবে নির্দ্বিধায় মেনে নেবেন বিশ্বস্রষ্টার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, “ তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে রাসুলের জীবনীতে ” (৩৩ : ২১) । আর যদি এতে সংশয় থাকে তবে হয় বিশ্বনবীর চেয়ে অধিকতর উত্তম আদর্শের অধিকারী কেহ থাকলে তার কথা-কর্ম এমনভাবে প্রচার করুন যেন দশজনে তা গ্রহণ করে ; নয় আপনি নিজকেই বিশ্বনবীর চেয়ে উত্তম আদর্শের অধিকারী হিসাবে প্রমাণ করুন যাতে মানুষ আপনাকেই অনুসরণ করতে পারে। এই তিনের বাইরে চতুর্থ যে কাজটি করা হচ্ছে অর্থাৎ আমাদের তরুণদের সামনে কোন আদর্শ নেই বলে হাহাকার ধ্বনি শুনানো হচ্ছে তাতে তাদেরকে অজ্ঞানতা আর নৈরাশ্যের সাগরে ফেলে দিয়ে আরো বিপথগামী করা ভিন্ন আর কিছুই হবে না ।

লেখক: মোহাম্মদ সালেক পারভেজ, সহঃ অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।