একজন ঢাবিয়ান ও একটি মেয়ে ছারপোকা


Published: 2017-01-30 21:57:59 BdST, Updated: 2017-09-26 00:53:28 BdST



সাদমান সাকিল: আমি একজন মৃত ছারপোকা। পাঁচ মিনিট আগে আমাকে একজন ঢাবিয়ান নৃঃশংসভাবে খুন করেছে। ঠিক কয়দিন আগে আমার জন্ম হয়েছে মনে নেই। ছারপোকারা পরিসংখ্যান পড়ে না তাই- মৃত্যুকালে আমার বয়স কত হয়েছিল তা আমি সঠিক জানি না।

তবে এটা মনে আছে আমার জন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের একটি গণরুমে। আমার জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই আমার খুনীর বন্ধুর হাতে আমার মা খুন হয়। তখন আমার শরীর অত্যন্ত ক্ষুদ্র ছিল- একারণে আমি স্রষ্ট্রার কৃপায় মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাই।

এরপরে আমি আমার খুনির রক্ত খেয়ে খেয়ে একটু একটু করে বেড়ে উঠি। আমার খুনির পুরো নাম আমিরুল কবির। ডাকনাম শিহাব। আমি শিহাবের একটি নীল শার্টের কলারকে বাসস্থান হিসেবে বেছে নিই।

এক শীতের সকালে ঘুম ভেঙে দেখি শিহাব কোথায় যেন যাচ্ছে। আমিও তার কলারে চড়ে সাথে রওনা দিই। দশ-বারো ঘন্টা পরে আমি শিহাবের গ্রামের বাড়িতে পৌছি। ছেলেকে কাছে পেয়ে ওর মা খুশিতে আত্মহারা। আমি ওর মায়ের চোখে জল দেখে কেঁদে ফেলি। তখন আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ে। মা বেঁচে থাকলে হয়ত আমার জীবনটা অনেক বেশি সুখের হতো।

পরের দিন বিকেলে ছেলেটা সমুদ্র দেখতে যায়। আমিও বিস্ময়ভরে সমুদ্র দেখি। ছারপোকা হয়ে জন্ম নিয়ে সমুদ্র দেখতে পাওয়া অত্যন্ত সৌভাগ্যের। শিহাব সমুদ্রের বালিতে বসে এক একা বাদাম খায়। আমি ওর কলারে বসে সূর্যাস্ত দেখি। দিনটি আমার জীবনের সেরা দিন।

কিছুদিন পর শিহাব ঢাকায় ফিরে আসে। একদিন খেয়াল করলাম শিহাব হলের এক কোণায় বসে একা একা কাঁদছে। তার কান্না আমি ছাড়া আর কেউ কখনো দেখেনি এবং আমি ছাড়া কেউই তার কান্নার কারণ জানে না। শিহাবের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তার বাবা নেই। মা ছোট একটা চাকরী করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নেয়।

শিহাবের জন্য তার মা একটা টাকাও পাঠাতে পারে না। জীবনের যুদ্ধে এত ঘা খেয়েও শিহাব নিয়মিত পড়ালেখা করে, মাঝে মাঝে কবিতা লেখে। আমি আমার জীবনে শিহাবকে কখনো দিনে দু'বার ভাত খেতে দেখিনি। সে দুপুরে একবেলা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়। এত্তো কম খাবার খেয়েও সে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রতি চারমাসে একবার করে রক্তদান করে।শিহাবের জন্য আমার খুব মায়া হয়।

ওর শরীরে রক্ত খাওয়ার জন্য চুমুক বসানোর আগে আমি অনেকবার ভাবি ওর রক্ত খাওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা।একসময় আমি সিদ্ধান্ত নিই শিহাবের শরীর থেকে অতি অল্প পরিমাণে রক্ত খাব। রক্তের স্বল্পতার কারণে আমার শরীরও একসময় শিহাবের মত শীর্ণকায় হয়ে আসে।

শিহাব খুব ভালো গান গায়। গভীর রাতে হলের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে শিহাব তখন একা একা ছাদে উঠে। আমিও তার কলারে চেপে ছাদে উঠি। শিহাব নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠে। আমি শিহাবের অনিন্দ্যসুন্দর মায়ামাখানো চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি।

মাঝে মাঝে আমিও শিহাবের দৃষ্টি লেগে থাকা নক্ষত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। কেন জানি শিহাবকে আমার খুব ভালো লাগে। ওর গায়ের গন্ধ, ওর হাসি, ওর নিদ্রিত চোখ বা শীতল নিঃশ্বাস সবকিছুই আমার মনে দাগ কেটে যায়।

শিহাব যখন ভোরের আগে আগে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ে আমি তখনো জেগে থাকি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ওর গালে উঠে একটা চুমু দিয়ে আসি। আমার খুব লজ্জা লাগে। আমি ওকে কখনো চুমু দিতে পারি নি!

একরাতে কিছু পুরুষ ছারপোকা হাঁটতে হাঁটতে শিহাবের কলারের কাছে চলে আসে। আমাকে ওরা দেখতে পায়। আমাকে দেখতে পেয়ে ওদের শরীরে কামনা জেগে উঠে। আমার শরীরে কামনার আগুন ঢেলে দেওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠে তারা। আমি কিছুতেই ওদের সুযোগ দিই না। দ্রুত পায়ে দৌড়ে শিহাবের বুকের ভেতর লুকিয়ে পড়ি। শিহাবের কোমল বুকের কালো কেশে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম ভাঙলেই নিস্তব্ধ রাতের শহরে একটা মাত্র শব্দই কানে আসে। শিহাবের হৃদয়ের ধুকপুক শব্দ। আমি না ঘুমিয়ে জেগে থাকি। ওর হার্টবিটের শব্দ আমার মনের দরজায় ধ্রুপদী গান হয়ে টোকা দেয়।

কিছুদিন পর খেয়াল করলাম শিহাব পাল্টে যাচ্ছে। সব সময়ই তার মুখে খুশি খুশি ভাব। ইদানিং সে ফোনে বেশি কথা বলে। নাদিয়া নামের একটা মেয়ের সাথে ওর খুব ভালো বন্ধুত্ব। শরতের এক দুপুরে শিহাব ও নাদিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটছে। হঠাত নাদিয়া তার ব্যাগ থেকে একতোড়া গোলাপফুল বের করে শিহাবের হাতে দিয়ে বলে উঠে- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি।'

শিহাব হাসিমুখে নাদিয়াকে গ্রহণ করতে দেরী করে না। এসব দেখে আমার ছোট্ট শরীরে প্রচন্ড শক্তিশালি বিদ্যুৎতরঙ্গ খেলে যায়। আমার চোখ ঘোলাটে হয়ে পড়ে। আমি ভাবতে থাকি এটাই কি আমার শিহাব? যাকে এতো ভালোবাসি সেই শিহাব? আমি অজোরে কাঁদতে থাকি। আমার কান্না শিহাব বা নাদিয়ার চোখে পড়ে না। তারা দুজন খুশি খুশি চেহারা নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

শিহাব আর নাদিয়া প্রচুর ঘোরাঘুরি করে। ঢাকা শহরের কোনো জায়গা ওরা বাকি রাখে না। প্রথম প্রথম দু'একদিন শিহাবের কলারে চেপে আমিও বের হতাম। ওদের ভালোবাসাবাসি আমার সহ্য হয় না। ওদের পাশাপাশি দেখলে আমার মনে হয় কে যেন আমার বুকে ধারালো সূচ দিয়ে অনবরত খুঁচিয়ে যাচ্ছে।

এরপরে অনেক দিন আমি ওদের সাথে বের হইনি। শিহাবের কবিতার খাতার ভেতরে আমি সারাদিন গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকি। মাঝে মাঝে কাঁদি, মাঝে মাঝে পাগলের মতো হেসে উঠি। হাসলে আমার শরীর থেকে গা ঘিনঘিনে করা একটা উৎকট গন্ধ বের হয়। প্রতিদিন রাতে শিহাব যখন হলে ফিরে আমি তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। সে যখন ঘুমিয়ে পড়ে আমি আমার দুর্বল পায়ে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে তার কানের লতিতে গিয়ে বসে থাকি।

চিৎকার দিয়ে বলি, 'শিহাব বাবু, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।' শিহাব আমার কথা কখনোই শুনতে পায় না।

একদিন কেন জানি আমার মনে হলো শিহাবের সাথে বাইরে বের হওয়া উচিত। নাদিয়ার সাথে ওর সম্পর্ক এখন কেমন তা জানা দরকার। আমি শিহাবের কলার আঁকড়ে ধরি। শিহাব আমাকে নিয়ে বের হয়ে পড়ে। নাদিয়ার সাথে দেখা করতে সে গার্লস হোস্টেলের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।

একসময় নাদিয়া হোস্টেল থেকে বের হয়। আমি কলারের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে নাদিয়ার দিকে তাকাই। নাদিয়া কাছে এসেই শিহাবকে বলে, 'এই শিহাব, তোমার কলারে ছারপোকা। ছিঃ।' শিহাব 'তাই তো!' বলে আমাকে দুই নখের ফাঁকে নিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে চেপে ধরে।

আমার রক্তে (বা শিহাবের রক্তে!) লাল হয়ে থাকে শিহাবের আশ্চর্যসুন্দর নখদুটো..

 

ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড.

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।