বিশ্ববিদ্যালয়ে অসম ভালোবাসা বনাম ভুল পথে হাঁটা!


Published: 2017-03-15 12:25:36 BdST, Updated: 2017-09-22 17:26:52 BdST

তোর লজ্জা করেনা, তুই পিতা মাতার ঘামঝরা টাকা দিয়ে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ডেটিং দিস, ফুসকা খাস? তোর বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছে, তবুও ওষুধ কিনে খায়না, তোকে টাকা পাঠাবে বলে, তোর কষ্ট যেন না হয় সেই জন্য। আর তুই কিনা সেই টাকা দিয়ে গার্লফ্রেন্ডের সাথে সারারাত ফোনে মিষ্টিমধুর প্রেমালাপ করিস ? কতদিন তুই নিজে না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে ওর জন্য রিচার্জ করে ওর সাথে কথা বললি। আর আজকে তোকে ছেড়ে গেল সে।

সে যদি পরিবারের কথা ভাবতে পারে তবে তুই কেন তোর মা, বাবা, ছোট ছোট দুইটা বোনের কথা ভাবতে পারলিনা? খুব স্বার্থপর হয়ে গেছিস তুই, তাইনা? কথাগুলো আবির ভাইয়া খুব রাগ দেখিয়ে বলেছিলেন অামায়।

আমি অনিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আবির ভাইয়া আর আমার বাসা পাশাপাশি। উনি আমার দুই বছরের সিনিয়র। আমার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি সবকিছুই জানেন। ক্যাম্পাসের প্রথম দিন থেকেই তাকে নিজের অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েছি।

গত বছরের ১৭ মার্চ, আমাকে সারাদিনটা রুমে না পেয়ে গিটার হাতে হলের ছাদে আবিষ্কার করেন তিনি। সে সময় আমি তার প্রিয় গানটা গাইছিলাম "আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে কর তোমার মনে যাহা লয় "। গানটা এমনিতেই অনেক ভাল গাইতে পারি আমি, তার সাথে যোগ হয়েছে বিরহ। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ সুরের সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। ওই গানটি গাওয়ার সময় এখনো কেন জানি আমার চোখে এমনিতেই পানি চলে আসে।

গত বছরের ১৩ ই মার্চ "বুড়ির " (ও আমাকে বুড়া এবং আমি ওকে বুড়ি বলে ডাকতাম) সাথে আমার ব্রেক আপ হয়েছে। মেয়েটা অনেক ভালবাসত আমায়। আমিও সেটা এখনো বিলিভ করি। সে আমাকে বৃদ্ধ বয়সে সুপারি পিষে দিতে চেয়েছিল, আমার দাঁত থাকবেনা বলে। তার একটা ছোটবেলার বালিশ ছিল। সেই বালিশ ছাড়া নাকি তার ঘুমই ধরতনা এবং এখনো সেই বালিশটাতে ঘুমায়। আমি ওর বালিশটায় শুইতে চাইছিলাম। সে অনুমতিও দিয়েছিল। তাই তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলাম, ঘর বাধার স্বপ্ন। আমার পরিবারের সবাই ওর কথা জানত। আমার ছোট বোন ও ওর সাথে কথা বলছিল। আমার পরিবার চাইত আমরা পড়াশোনা শেষে বিয়ে করি।

কিন্তু বুড়ির পরিবার রাজি ছিল না। তারা বুড়িকে তাদের পছন্দে বিয়ে দিতে চায়। এমন কথা শোনার পর দুজনেই অনেক কেঁদেছিলাম। তারপর ও বলল, আমরা রিলেশন করব, চার বছর পর বিয়ে করব তবে পারিবারিকভাবে হলে হবে, না হলে বিয়ে করতে পারবনা। আমি বললাম, তোমার কথাই মানলাম আমি। তারপর কিছুদিন আগের মতই খুনশুটি চলল বুড়া- বুড়ির মাঝে।

কিন্তু গত বছরের মার্চের ১৩ তারিখ বুড়ি আমাকে জানাল আর রিলেশন করা সম্ভব না। তার ফ্যামিলি দ্রুত তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। এরপর তাকে অনেক বুঝিয়েছি আমি, জাস্ট চারটা বছর চেয়েছিলাম তার কাছে যাতে সে তার পরিবারকে ম্যানেজ করতে পারে। কিন্তু সে রাজী হয়নি। সকল সম্পর্ক ত্যাগ করে চলে গেছে।

আজ এক বছর পূর্ণ হল, সে চলে গেছে। মাঝে মাঝে  নিজের অজান্তেই চোখের কিনারা বেয়ে স্রোতের মত চোখের জল পড়ে। আজো তাকে খুব মিস করি।।

সেইদিন আবির ভাইয়া আমাকে অনেক ভাল ভাল কথা বলেছিল। তিনি বলেছিলেন :

এক. আমাদের মত ফ্যামিলির প্রেম ভালবাসা করা শোভা পায় না, এসব এরিস্ট্রোক্যাট ফ্যামিলির জন্য। তোর বাবা অসুস্থ, চিকিৎসা না করিয়ে তোকে টাকা দেয়, আর সেই টাকা কি করে তুই মেয়ের পিছনে ব্যয় করিস, তোর বিবেক বলতে কিছু আছে?

দুই. মেয়েরা যতই বলুক যে আমি যা করব আমার পরিবার তাই মেনে নিবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা খুব কম পরিবারেই দেখা দেয়। তোর যদি ভাল একটা জব না থাকে তবে মেয়ের বাবা মা কোনদিনই তোর সাথে মেয়ের বিয়ে দিবেনা। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলে একসময় মেয়ে তোকে ছেড়ে যাবে। শুধু ভালবাসা দিয়ে লাইফ চলেনা। জীবনে চলতে গেলে টাকাও লাগে।

তিন. আজকালকার রিলেশনশিপ গুলোতে কোন প্রকার কমিটমেন্ট কেউ রাখেনা। রিলেশনের শুরুতে সবাই বলে আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবনা কিন্তু যখন ব্রেক আপ হয় ঠিকই বেঁচে থাকে কিন্তু। এসব মন ভোলানো কথা শোনার টাইম নেই আমাদের।

চার. একটা কথাই মনে রাখবি, নিজের পরিবারকে ছাড়া আর কারো কথা ভাববিনা। যদি নিজের পরিবারের কথা অলয়েজ ভাবিস তবে তুই সফল হবি।

পাঁচ. পৃথিবীতে সবাই স্বার্থপর, নিজের পিতা মাতা ব্যতিত। এরকম ভালবাসা তোর বাবা মাকে বাস তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে ভাল রিটার্ন পাবি।

ছয়. আর মেয়েকে নিয়ে ভাবিস? পদমর্যাদা, ভাল ক্যারিয়ার তৈরি কর, মেয়ের চৌদ্দ গোষ্ঠী তোর পিছনে পড়ে থাকবে তোর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য।

সাত. এই কথাটা ভাল করে শুনে রাখ, মানুষের জীবন অনেক গুলো অংশের সমষ্টি। তার মধ্যে প্রেম ভালবাসা একটি অংশ। এই একটি অংশ সফল করতে গিয়ে যদি জীবনের বাকি অংশগুলো ব্যর্থ হয়ে পড়ে তবে তোর সারাজীবন দুঃখ কষ্ট থাকবে। রিমেম্বার ইট অলওয়েজ।

- আজ এক বছর পার হয়ে গেছে, বুড়িটা ও চলে গেছে এবং আবির ভাইয়াও আর ক্যাম্পাসে নেই। দুজনকে খুব মিস করছি আজকে। হয়তবা একটু পড়েই গিটার নিয়ে হলের ছাদে উঠব। আজকে আবারো আমার গিটারের সুরে বেজে উঠবে, "আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে কর তোমার মনে যাহা লয় "।

কিন্তু গলাটা ধরে আসবে হয়ত তাই গানটা আর শেষ করতে পারবনা...


কালেক্টেড : মাসুদ রানা
হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


ঢাকা, ১৫ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।