বোকা মেয়ে, আমাকে ছেড়ে যাবে কী করে?


Published: 2017-04-23 00:49:31 BdST, Updated: 2017-11-23 20:50:58 BdST

আমি আকাশ হওয়ার পর পোস্ট অফিসের সেই চিরচেনা ডাকপিয়ন তোমার দরজায় চিঠি হাতে সাইকেল নিয়ে আর কখনো বেল বাজাতে আসেনি। অহনা! বলে ডাক দিয়ে আর বলেনি, এই তোর চিঠি এসেছে। স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে যে নিয়মিত তোমার দরজায় পৌঁছে দিতো আমার ভালবাসার চিঠি। আর তুমি অধীর আগ্রহে বসে থাকতে সপ্তাহে একটি ভালবাসার চিঠির প্রত্যাশায়। আমার লেখা শেষ চিঠিটার জন্য তুমি অপেক্ষায় থাকতে পারোনি। আমি কিভাবে যেনো বুঝতে পেরেছিলাম, ভালবাসার শেষ চিঠিটা তোমার হাতে কখনো পৌঁছাবে না। ভালবাসার ডাকপিয়ন আমার জন্য প্রায়ই তোমার চিঠি নিয়ে আসতো। চিঠিতে লেগে থাকতো তোমার হাসি, বাঁকা বাঁকা লেখা, চোখের কাজল, বোকা বোকা ভাব, ভালবাসার জড়ানো হাজারো আবেগজড়িত কথামালার ফুলঝুরি।

তুমি কবে আসবে? কতদিন দেখি না তোমায়? কবে তোমার লেখাপড়া শেষ হবে? লিখে পাঠাতে তোমার ভালবাসার গানের কথাগুলি, কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা সে চিঠি আমি গুঁজে রাখতাম আমার বুক পকেটে। তোমার চিঠির উত্তরে প্রায়ই লিখতাম, এইতো আমি চলে আসবো! আর কটা দিন মাত্র। আমিতো তোমারই আছি, একজীবনে শুধু তোমাকেই ভালবাসি। ভালবাসাময় জীবনের তিনটি বছরে শেষ চিঠিতে তোমাকে যতোটা কাঁদতে দেখেছি। আর কোনোদিন তোমাকে এতোটা কাঁদতে দেখিনি।

চিঠির ভাষাগুলো পড়তে পড়তে আমার চোখ বেয়ে অঝোরে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিল। আমি বারবার ভাবছিলাম, আমার এখন কী করার আছে? কিভাবে পাবো তোমায়? তোমাকে এভাবে হঠাৎ এতোদুর হারিয়ে ফেলবো, আমি কখনো ভাবতেও পারিনি। আমিতো আসছিলাম তোমার কাছেই। তোমার আমার জীবনের ছোটছোট স্বপ্নগুলো পূরণের প্রত্যাশায়, আমি একটু দূরে চলে এসেছিলাম। এইতো আমার সবকিছু প্রায় শেষের দিকে ছিল। ফিরবো ফিরবো বলে একটু দেরি হয়ে যাচ্ছিল। আর একটু দেরি করতে পারতে, তুমি।

২।
অহনা তুমি ভাবতে পারো। তোমার চিঠির কথাগুলো আজও আমি শুনতে পাই।

প্রিয়তম রৌদ্দুর,
হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা নিও। জানি না তুমি কেমন আছো? তোমাকে ছাড়া আমি ভালো নেই। গত সপ্তাহে তোমার কোনো চিঠি আমার কাছে আসেনি। এমনতো কোনোদিন হয়নি। তোমাকে কী করে বোঝাবো? আমার ভালবাসার স্বপ্নগুলো আজ এক এক করে ভেঙ্গে পড়ছে। তোমাকে চিঠি লেখার মতো আর কোনো সুযোগ আমার কাছে নেই। বোবো কান্নায় দু'চোখ ভেসে যাচ্ছে। দিন কাটছে না অপেক্ষায়। ভাবছি এই বুঝি তুমি ফিরে এসেছো  কিন্তু সে শুধু আমার শুধুই কল্পনা, আমার স্বপ্ন। চিঠিতে তোমাকে কতবার আসতে বলেছিলাম।

তুমি আসোনি, তুমি আমার কথা বুঝতে পারোনি। আমার আজ কী করার আছে, তুমি বলতে পারো। তোমার হাতে যখন এই চিঠি পৌঁছাবে, তখন হয়তো আমি আর তোমার নেই। আমি কী করে মেনে নিবো এসব? কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আজ আমার গায়ে হলুদ, দুদিন পর আমার বিয়ে। এক বন্ধুর দ্বারা চিঠিটা পাঠালাম। আমি ঠিক জানি না। এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না?  চিঠিটা যদি হাতে পাও। তাহলে তুমি দেরি না করে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়িতে উঠে পড়। আর হয়তো তোমাকে কখনো চিঠি লিখতে পারবো না। তুমি আমাকে ছাড়া ভাল থাকবে কি করে? আমি জানি না। জানো খুব ইচ্ছে ছিলো আমাদের দু'জনের ছোটছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করার। তা আর মনেহয়  হলো না। তোমার ভালবাসা ছাড়া বাঁচবো কি করে? আমি জানি না। এ জীবনে তোমার হতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিও। মনে রেখো আমি তোমারই ছিলাম। আজীবন তোমারই থাকবো।


(চিঠির কিয়দংশ অপ্রকাশিত)
ইতি
তোমার ভালবাসা
অহনা।

৩।
তোমার ভালবাসার শেষ চিঠিটা যখন হাতে পেলাম তখন ছিলো বিকেলবেলা। কিছুক্ষণ আগেই ডাকপিয়ন এসে চিঠিটা হাতে দিয়ে গেলেন। চিঠির খামটা হাতে নিতেই বুকটা কেমন জানি আচমকা কেঁপে উঠছিলো। ডাকপিয়নকে বিদায় জানিয়ে রুমে এসে চিঠিটা খুলতেই দেখলাম কান্নামাখা তোমার এ চিঠি। চিঠিটা পড়তে পড়তেই বোবা কান্নায় আমার বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। চিঠিটা আমার হাতে পৌঁছার তিনদিন আগেই তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। আমার তখন কী করা উচিত? কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। তোমাকে হারিয়ে ফেলার কষ্টে বেদনায় পৃথিবীর সব কষ্ট এসে আমার বুকের উপর ভর করেছিলো। কান্নায় ভেসে যাচ্ছিলো আমার দু'চোখ। বিকেল হতে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা হতে গভীর রাত্রি পর্যন্ত তোমার কান্নামাখা চিঠিটা শুধু দেখছিলাম। আমাকে লেখা তোমার সব চিঠিগুলো সেদিন রাতে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়েছিলো। স্বযত্নে রাখা তোমার সব চিঠির ভাঁজ খুলে সেদিন আমি শেষবারের মতো দেখেছিলাম। তোমাকে চিঠি লেখার মতো আর কোনো ঠিকানা আমার কাছে ছিলনা। তোমাকে হারিয়ে ফেলার অভিমানে সেদিন ডায়েরির শেষ পাতাটায় গভীর রাতে আহত এক হৃদয় নিয়ে লেখেছিলাম শেষ চিঠিটা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এ চিঠিটা কখনো তোমার হাতে পৌঁছাবে না, পৌঁছাবার কোনো কথাও ছিলো না। তুমি বিশ্বাস করবে কি না, জানি না। চিঠির কোথাও তোমাকে আমি ফিরে আসতে বলেনি।  শুধু লিখেছিলাম, " ঈশ্বর! দু'জন হৃদয়ের এতো ভালবাসা দিয়ে কেনো তুমি এভাবে কেড়ে নিলে? তাহলে কেনো এতো ভালবাসার আয়োজন ছিলো? আমরা তো শুধু দু'জন দু'জনকে ভালই বেসেছিলাম। শুধু আমাদের জীবনটাই কেনো এমন হলো?  অহনা! আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। তোমার ভালবাসা ছাড়া আমার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আমি আকাশ হয়ে তোমার পাশে থাকবো। আর শুধু তোমাকেই ভালবাসবো।"

আমার অমর প্রস্থানে শেষ চিঠিটা আর ডাকবাক্সে তোমার ঠিকানায় পাঠানো হয় নি। কী ভাগ্য আমার! চিঠিটা আকাশের ঠিকানায় পাঠানোর আগেই, আমি তোমার বিকেলবেলার শুভ্র আকাশ হয়ে গেলাম। এই বোকা মেয়ে, এখন তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে কি করে? বলো!!


লেখক : শামসুজ্জোহা বিপ্লব
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


ঢাকা, ২৩ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//জেএন

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।