কলেজ পড়ুয়া ছাত্রের আম উৎপাদনে সফলতার হাতছানি


Published: 2017-04-05 11:00:46 BdST, Updated: 2017-09-21 12:55:36 BdST

 

নজরুল ইসলাম তোফা: ফাল্গুনের শুরুতেই আকাশে বাতাসে আমের মুকুলের মৌ-মৌ গন্ধে প্রকৃতির ভারসাম্য এক আলাদা রূপে বিরাজ করে। রাজশাহী অঞ্চলে দেখা মেলে গাছে গাছে বিভিন্ন প্রজাতির আমের মুকুল। মুকলিত আমের বাগানে দৃষ্টি দিলে চোখ জড়িয়ে যায় এমন আবহে। বাগানের সারি সারি আম গাছ সত্যিই এক নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, উত্তরাঞ্চলের জনপদ হয়ে উঠে রাজশাহীবাসীর আড্ডা দেয়ার প্রান কেন্দ্র। আসলেই মালিকদের আম বাগান প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যের এক শৈল্পিকতায় নরম ছায়া ছড়িয়ে দেয়। শৈল্পিক শোভা বর্ধনে এমন ছায়া শুনিবিড় অঞ্চলে আমের মুকুল বা আম বিষয়ক অতি প্রাচীন এক ইতিহাস রয়েছে। তাই ইতিহাসের সাক্ষী স্বরূপ, আম প্রধান রাজশাহী শহরকে সৌন্দর্য্য বর্ধনে তিনটি কাঁচা-পাকা আম দিয়ে নির্মিত হয় রড সিমেন্টের ভাস্কর্য। এমন সৌন্দর্য্য রাজশাহী শহরের উত্তরে নওগাঁ রোড ও পূর্ব পশ্চিম আর একটি রোড রয়েছে বিধায় নামটি দিয়েছে 'আম চত্বর'। ছোটবেলা থেকে প্রতি দিন এমন দৃশ্য দেখেই এক যুবক আম নিয়ে স্বপ্নে বিভোর হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বসত বড় হতে না হতেই তার বাবার মৃত্যু হয়, সেই স্বপ্ন কেন যেন অভাবের তাড়নায় হাতের নাগালে ধরা দেয়। বাবার বড় ছেলেটি লেখাপড়ার পাশা পাশি সংসার পরিচালনায় আম ব্যাবসা নেমে পড়ে। এই পরিশ্রমী যুবক আম উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যে মজা পান, নাম তার শেখ মো: আহানাফ আবিদ। পিতা মৃত শেখ আনোয়ারুল ইসলাম। মমতাময়ী মা মোছা: আইরিন আম্বিয়া, স্নেহের ছোট্ট বোন মোছা: আশিকা সাবাতিনকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। তার পড়াশোনা দাওকান্দি কলেজে, একাউনটিংয়ের এই মেধাবী ছাত্র অনার্স বিবিএ পড়ছেন।

তিনি বলেন, আম গাছ সমৃদ্ধ  রাজশাহী শহরের উত্তরে জিয়া পার্কের পেছনে তার বাসা। বাসার পাশেই অবস্থিত আম বাগান গুলোতে সোনালী মুকুলের পর আমের গুটি দেখা দিয়েছে। মুকুল আসার আগেই আম গাছে প্রতি নিয়ত বিভিন্ন ধরনের পরিচর্যা শুরু হয়। বাগান মালিক বা চাষীরা মাঘের শুরুতেই আমের ফলন ভালো করানো জন্য  খেয়াল রাখে এবং আম গাছের মুকুলিত ডালে ডালে ঔষধ প্রয়োগ ও পরিচর্যা শুরু করে। কীটপতঙ্গের হাত হতে মুকুল রক্ষাকারী কীটনাশক ও ছত্রাক নাশক এমন ঔষধ এবং সেচ, সার প্রদানসহ অন্যান্য যাবতীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত হয়। আবিদের মতে, ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে গাছে গাছে যে পরিমাণ মুকুল ধরে তার সিকিভাগ টিকে থাকলেও বাম্পার ফলন পেতে পারেন।

আবিদ বলেন, আম প্রাপ্তির জন্য অনূকুল আবহাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির প্রতিকূলতার বেড়া জাল ডিঙ্গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবার কোনই পদক্ষেপ থাকে না বাগান মালিকের। স্বয়ং সৃষ্টি কর্তার দেওয়া এমন ভয়াবহ দুর্যোগ আম বাগান মালিকদের কষ্টে শিষ্টে নিরব থেকে দিন গোঁজার করা বাঞ্ছনীয়। এই দুর্যোগের কারণে আমের বাজার দর অত্যন্ত উর্ধমুখী হয়ে উঠে। পরিশ্রমী আবিদের নিজস্ব গবেষণার এক  মতামত তা হলো, হুট হাট করে গরম আসা আবার শীতের পরিমাণ বেশি হওয়া আম গাছে মুকুলের জন্য ঠিক না। আস্তে আস্তে শীত কেটে আস্তে আস্তে গরম পড়লেই হয়তো আমের মুকুল বা আমের কচি গুটির জন্য অবশ্যই ভাল। সেহেতু এবার অনেক অংশে আম উৎপাদনের জন্য ভালো মৌসুম সেহেতু হালকা বৃষ্টি হলে মন্দ হতো না। কারণ রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী জনপ্রিয় আম, সেরা আমে পরিনত হবে এমন আশা ব্যক্ত করেন। আমের জন্য এই বছরের  মৌসুম ভালো বলেই আমের গুটি টিকবে বেশি, শেষ পর্যন্ত পাকা আম পাওয়া যাবে প্রচুর, সেগুলো খেতে হবে মিষ্টি এবং সুস্বাদু। আবিদ সহ আম বাগান মালিকের আশা আকাঙ্খা এমন পরিচ্ছন্ন মৌসুম, উৎসবের আমেজে প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসুক।

রাজশাহী বিভাগের মানুষজন তাকিয়ে থাকে কখন আসবে ঘরে আম। কাঁচা আমের চাহিদা পূরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক বৃষ্টি আর ঝড়ের কোনো বিকল্প নেই। এমন মৌসুমী কাঁচা ফল পেতে বাগান মালিকরা নারাজ। দরকার আর অদরকারী প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে চাষিরা কষ্ট পেলেও চাষীর বউ খুশিই থাকে। কারণ, প্রকৃতির এমন আচরণে কাঁচা আম কুড়িয়ে এনে কেটে-কুটে শুকিয়ে চমৎকার আমের আচার করে বয়াম ভর্তি রাখতে পারে। আবার খাবার ডালের মধ্যে রান্নাকৃত ঝোলে কাঁচা আম প্রতিদিন ব্যবহার করে টক টক ভাবটুকু আস্বাদন করে। দুরন্তপনা ছেলে-মেয়ে দল গ্রামীন মেলায় চাকু-ছুরি কেনে কাঁচা অপরিপক্ক আম কেটে লবণ, হলুদ, মরিচ আর সরিষা বাটা তেল মাখিয়ে ভর দুপুরে কলা পাতায়  নির্জন গাছতলায়  খায়। আহা! কি যে মজা, সেই মজার দিনগুলো ছিল শৈশব স্মৃতি। নজরুল ইসলাম তোফা লেখা মাঝে মাঝেই ফিরে পেলেন আনন্দ, আহানাফ আবিদের কথা শুনে। মগডালে আমে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে থাকা, কখন একটি  আম পড়বে মাটিতে আর সেই আম কাড়া কাড়ি করে নিজ হস্তে নিয়ে সবাই মিলেই খাবে। বন্ধুর প্রতি বন্ধুদের ভালোবাসার এমন দৃষ্টান্ত রাজশাহী না এলে অপূর্ণতা রযে যাবে। আম গাছে মালিকের দৃষ্টি খুব কম থাকে, দুরন্তপনা বালকদের ঢেল ছোড়ে আম পেড়ে খাওয়া নিয়ে কোন অভিযোগ থাকে না, এমন ভালোবাসার অঞ্চল এই উত্তরবঙ্গের রাজশাহী।

আম চাষের পরিচর্যা নিয়ে আবিদ বলেন, অনান্য বারের তুলনায় এবার গাছে গাছে আম বেশি ধরেছে দামও এবার অনেক বেশি পাবেন। তবে আবহাওয়া যদি ভালো থাকে আর যদি কাল বৈশাখী ঝড় শিলা বৃষ্টি না হয় তাহলে বেশি পরিমানে আম গাছ থেকে আম সংগ্রহ করতে পারবেন। আরো জানান এই আম দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই সংগ্রহের উপযোগী হবে। রাজশাহীর আম সারা দেশের মানুষের কাছে খুব পরিচিত এবং চাহিদাও অনেক বেশি। কেবল দেশেই নয় দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে আম ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, রাজশাহীর আম খুব সুস্বাদু ও পুষ্টিকর, তা দিয়ে জামাই আদর ও অতিথিদের আপ্যায়ন করতে এই অঞ্চলের মানুষ কার্পণ্য করে না। হরেক রকম  আমের পসরা সাজিয়ে দই, চিড়া, মুড়ি, মুড়কি, রসগোল্লা, স্বন্দেশ মিশ্রত খাবার পরিবেশন করে মজা পায়। রাজা ফজলি, ফজলি, তোতাপরি, ল্যাংড়া, লখনা, হিমসাগর, দুধসর, আম্রপলি, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, বৌভুলানী, রানীপছন্দ, কৃষাণ ভোগ, মলি¬কা, বারি-৪, মিশ্রীদানা, রাণী পসন, আরজান, দুধকলম, সিঁন্দুরী, বোম্বাই, হালের রানী, হাড়িভাঙা, জামাইখুসি, লনভোট,  ক্ষিরসাপাত, গোপাললাড়ু, মোহনভোগ, লক্ষণভোগ, গোপালভোগ, কালীভোগ এবং আশ্বিনা জাতের প্রভূতি আম অনেক বেশি পরিমানে চাষ হয় এবং তা জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করে। আমের কদর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে রাজশাহীর আম আলাদা। এমন কোয়ালিটি পূর্ণ আম সারা দেশের মানুষের কাছে মৌসুমী ফলের রাজা নামে পরিণত। রাজশাহী ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চল যেমন: চাঁপাই নবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, পাবনা, নাটোর সহ সকল জেলাতেই বড় বড় আমের বাগান রয়েছে। উত্তরবঙ্গের রাজশাহীতে আমের বাগানে বেশ ফলন হয়। যেমন: বাঘা, পবা, তানোর, দুর্গাপুর, চারঘাট, গোদাগাড়ী ইত্যাদি। লাভজনক আমের ব্যবসা হওয়ায় প্রতি বছরই আম বাগানের সংখ্যা বাড়ছে। তবে নতুন ভাবে গড়ে ওঠা আম বাগান গুলোর অধিকাংশই বনেদি জাতের। রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় আড়াইশ’ জাতের আমের চাষ হয়। যে জমিতে আগে বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য শষ্য উৎপাদন হতো সেই জমিতে বর্তমানে উন্নত জাতের আম উৎপাদন করে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে জমির মালিকরা। সার, জ্বালানী ও বীজের অধিক মুল্যবৃদ্ধি, তাছাড়া উৎপাদিত খাদ্য শষ্যের সঠিক মুল্য না পাওয়ায় আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে রাজশাহীর বাগান মালিকরা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেক আগেই গাছে গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমের মুকুল ধরেছে এবং তা ছোট ছোট গুটিতে রূপ নিয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, এখন আম চাষের ধরন পাল্টেছে সেহেতু বাগান মালিকরা বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ ও বাজার জাত করে খুব ভালো মুনাফা পাবেন।

সর্বশেষ বলতেই হয় শেখ মো: আহানাফ আবিদ শুধুমাত্র শখের বশেই নয়, প্রতি বছর আম উৎপাদন ও বিক্রয় কাজে শ্রম দিয়ে ভালো মুনাফা পান। সেহেতু জীবন-জীবিকার জন্য প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে আম চাষকে লেখাপড়ার পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন। সংসারে তার লেখাপড়ার খরচ সহ ছোট বোন আশিকা সাবাতিনকেও পড়াশুনার খরচ দিতে হয়। আমের বাগান সহ বাড়ির আঙ্গিনাতেও দুই একটি আম গাছ শখের বশে লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, অর্থে জন্য এমন আম উৎপাদনের শ্রম দিতে হয়। লেখাপড়ার শেষে চাকরীর পাশাপাশি আরো কিছু আম উৎপাদনের জমি ক্রয় করে অধিক ফলন সম্পন্ন আম চাষ করবেন।

 

ঢাকা, ০৫ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।