প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অমন্ত্রণে ভারতে ১০০ তরুণ-তরুণী


Published: 2017-01-12 18:47:37 BdST, Updated: 2017-09-24 12:50:46 BdST


জবি লাইভ: ১০০ তরুণের প্রাণের স্পন্দন ভারতের বুকে তৈরি করেছিল ছোট্ট বাংলাদেশ। সংস্কৃতির আদান-প্রদান, এপার-ওপারের তরুণদের এই মহামিলনের গল্প শোনাচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফলিত পদার্থ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এম,এস,সি ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আইরিন।

বিজয়ের মাসের ৪ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত ৮ দিন ১০০ তরুণ-তরুণী বিজয়ের উল্লাসে মেতেছিল ভিন্নদেশে। দিল্লী, আগ্রা, আহমেদাবাদ ও কলকাতা। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আনন্দ, গৌরভ আর উচ্ছ্বাসে ভরা। অসাধারণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভারত সরকারের আতিথেয়তায় মুগ্ধ সবাই। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভারত সরকার বিজয়ের আনন্দ দিয়েছে আমন্ত্রিতদের।

সফর শুরুর আগে গত দেড় মাস ধরে উত্তেজনা কবে ভারত যাব। অবশেষে সেই দিন ঠিক হলো বিজয় মাসের ৪ তারিখে। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার ছিল, রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে যাওয়ার ব্যাপারটা। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী, অভিনয় শিল্পী, গায়ক-গায়িকা, মডেল, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লেখক, প্রকাশক ও ক্রিড়াবিদের ১০০ জনের এই প্রতিনিধিদলটি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের স্ব স্ব স্থানে যোগ্যতার প্রমাণ করে এবার পাড়িদেয় ভিন দেশে; এবার উদ্দেশ্য নিজের দেশকে, নিজের সভ্যতা, নিজের সংস্কৃতিকে অন্য দেশে তুলে ধরা।

৪ ডিসেম্বর, ২০১৬; ঢাকা এয়ারপোর্ট: সকাল ৭টায় ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্টের ৩নং টার্মিনালের সামনে যেতেই চোখে পড়লো লম্বা লাইন, সবার গলাতেই বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন-২০১৬ লেখা আইডি কার্ড, কাঁধে একই ব্যাগ। স্বস্তি পেলাম, যাক ঠিক সময়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে পেরেছি ভেবে। জীবনের প্রথম প্লেন যাত্রা, তাও আবার ইয়ুথ ডেলিডেটস হিসেবে। ভাবতেই এক অজানা ভাললাগা কাজ করছিল মনে। ধিরে ধিরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল ১১টায় জেট এয়ারের বিমানে বাংলাদেশের ১০০ তরুণের ভারত যাত্রা শুরু হলো। জীবনের প্রথম উড়াটা সত্যিই অনেক রোমাঞ্চকর।

২ ঘন্টা ৪০ মিনিটের যাত্রা শেষে দুপুর দেড়টায় দিল্লি ইন্দিরাগান্ধী বিমানবন্দরে অবতরণ। রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যেরকম সম্মাননা ও পুলিশ প্রটোকল দেওয়া হয় ঠিক সেরকম সম্মাননা টের পেলাম আমরা। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল বাংলাদেশের ১০০ তরুণকে রাষ্ট্রীয় সফরের এ সুযোগ দিয়ে আসছে ভারত সরকার। এই সুযোগে আমাদের দেখা হয়ে যায় ভারতের ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনাগুলো।

প্রথমদিনের দিল্লি দর্শন: ৪ ডিসেম্বর দুপুরে দিল্লির ইন্দিরাগান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পরপরই আমাদের ৫০ জন তরুণ ও ৫০ জন তরুণীর এই প্রতিনিধি দলটি ৩টি দলে বিভকক্ত করা হয়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা এবং দুপুরের খাবারের পর আমরা হাজির হয় ভারতের জাতীয় জাদুঘরে। হরপ্পা-মহেঞ্জদারো সভ্যতা থেকে শুরু করে প্রাচীন ভারতের নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন আর পুরাকীর্তির দেখা মেলে সেখানে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের হাড়ও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

গোধূলিলগ্নে ইন্ডিয়া গেট: জাদুঘরের জাদুর ছোঁয়া নিয়ে আমাদের পুরোদল ইন্ডিয়া গেট পৌঁছালো গোধূলি লগ্নে। সাপ্ততাহিক ছুটির দিনে দর্শনীয় দুয়ার দিয়েই শুরু হলো আমাদের ভারত দর্শন। ইন্ডিয়া গেটের দর্শন পেয়েই উল্লাসিত আমরা, শুরু হলো সেলফি আর ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। বিজয়ের ‘ভি’ চিহ্ন এঁকে সবাইকে নিয়ে ইন্ডিয়া গেটের সামনে থেকে ছবি তুললেন ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের সফরের সমন্বয়ক কল্যান কান্তি দাস। সবাইকে পেছনে রেখে একের পর এক কল্যান দা’র সেলফি বাড়তি আন্দন আর উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। আমাদের ১০০ জনের দল নিয়ে যখন গেটের সামনে তখন পা ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই। মূলত ইন্ডিয়া গেট ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে গিয়ে যেসব ভারতীয় সেনা জীবন দিয়েছিলেন তাদের স্মরণে এই ইন্ডিয়া গেটে স্থাপন করা হয়েছে ‘অমর জওয়ান জ্যোতি’।

মেট্রোরেলে পথ হারানো: বাসের বদলে মেট্রোরেল, কিছু সময়ের জন্য ঘুরে দেখা। মেট্রোতে ভ্রমনের মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যাই কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে আধুনিক দিল্লি। ভারতীয় কর্মকর্তারা মেট্রো স্টেশনেই আমাদের ১০০ জনের হাতে দিয়েছিলেন জোড়বাগ স্টেশনে ফেরার টোকেন। কিন্তু ৩টি দলের মধ্যে ১টি দল ভূল করে উল্টোদিকের ট্রেনে চেপে বসায় ঘটে বিপত্তি। কারো ফোনে ভারতের সিম নেই, যথেষ্ঠ ভাংতি রুপিও নেই পকেটে। তাই নিয়ে আমাদের বাকি ২ দলের দুশ্চিন্তার কমতিও ছিল না। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় কর্মকর্তাদের তৎপরতায় উল্টোপথের ১১টি স্টেশন ঘুরে ফিরে আসে ‘হারিয়ে যাওয়া’ দল।

এইবার চললাম হোলেটের দিকে, দ্যা আশোকা, দিল্লির ৫ তারা বিখ্যাত হোটেল গুলোর একটা। সুবিশাল এই হোটেলেই কাটে আমাদের দিল্লির রাতগুলো।

অগ্নি শিখায় প্রজ্বলিত রাজঘাট: ৫ তারিখ ঘুম ভাঙল সকাল ৭টার ওয়াকআপ কলে। দ্রুত রেডি হয়ে নাশতার সারিতে দাঁড়ালাম। নাম না জানা নানা নতুন নতুন পদ খেয়ে শেষ হল সকালের নাশতা। নাশতা শেষে রওনা হলাম রাজঘাটের মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধের উদ্দেশ্যে। সবুজে ছাওয়া গান্ধীর সমাধিসৌধটির চারপাশের পরিবেশে মন ছুঁইয়ে গেল। খালি পায়ে কাঁচা সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে সমাধি স্থলে পৌঁছিয়ে দেখি শত শত পর্যটক ও গান্ধীভক্ত এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে।

এবারের গন্তব্য দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লা: ৫ ডিসেম্বর সকালে রাজঘাটে অহিংস অন্দোলনের প্রবাদপুরুষ মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধ দেখে ছুট দিলাম দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায়। কিন্তু বিধিবাম। বন্ধ থাকাইয় ভেতরে ঢোকা গেল না। আড়াইশ একরের বেশি জমির ওপর নির্মিত এ দুর্গের সীমানা দেয়ালের বাইরের স্থাপত্য রূপ দেখেই চোখের ক্ষুদা মেটাতে হলো। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার রাজেশ উইকের সাথে সেলফি তুলেই পের হয় সময়।

পবিত্রতার ছোঁয়ায় জামে মসজিদেঃ এরপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত দিল্লি জামে মসজিদে। কেল্লা থেকে কিলোমিটার খানেক এগোলেই বিখ্যাত সেই মসজিদ। দিল্লি জামে মসজিদ, খুব সম্ভবত প্রশান্তির আর এক নাম। এটা পুরোনো দিল্লিতে অবস্থিত। লালা বেলেপাথর ও মার্বেলপাথর দিয়ে তৈরি এই মসজিদে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে প্রায় ২৫ হাজার মুসল্লি।

রাষ্ট্রপতি ভবন ও রাষ্ট্রপতির দর্শন: দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে হোটেলে ফিরেই আমরা প্রস্তুত হতে থাকি সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। দেশটির প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতিকে কাছ থেকে দেখা অনেকটা স্বপ্নেরমতো। ভবনের ৫৪টি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় আমি যেন আর আমি তে ছিলাম না, একটা ঘোড়ের মাঝে ছিলাম, স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর কিছু একটা অনুভুতি কাজ করছিল তখন। ‘রাষ্ট্রপতি ভবন’ পৌঁছে চলতে থাকে সেখানকার নানা আনুষ্ঠানিকতা আর সাক্ষাতে কথবার্তা বলার মহড়া। সন্ধ্যা গরাতেই অনন্ত সাধাসিঁধেভাবে দরবার হলে প্রবেশ করেন ভারতের প্রথম বাঙ্গালী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ভারতের স্বাধিনতা আর নানা সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাক্ষী সেই দরবার হলে দাঁড়িয়ে বাঙালী রাষ্ট্রপতি শিল্প-সংস্কৃতির কোন সীমা নেই সেই কথাও আমাদের মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘ তরুণরাই কান্ডারি, তারাই ভবিষ্যৎ, তারাই একদিন দেশের হাল ধরবে’। তার কথাগুলো আমাদের সামনের পথ চলার তাৎক্ষনিক অনুপ্রেরণা দেয়। সাক্ষাতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেপাশে থাকার স্মৃতিচারনও করেন। শুভেচ্ছা স্মারক, বক্তব্য আর ফটো সেশন একে একে সব শেষ হয়, কিন্তু মনে হয় সব যেন এক নিমেষেই উড়ে গেল। দরবার হল পেরিয়ে আমাদের চার দরজা টপকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রাষ্ট্রপতি ভবনের সুবিশাল ডাইনিং হলে। সেখানে প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সাথে গল্পে আড্ডায়   মেতে উঠেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিজয় গয়াল। গল্প, আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ায় শেষ হয়ে আসে সময়।

আগ্রাতে সারাদিন: পরদিন খুব ভোরে আগ্রার পথে ছুটলাম। গন্তব্য মোগল সম্রাট শাহজাহান পত্নীর সমাধিস্থল। কুয়শাঘেরা ঠান্ডা বাতাস কেটে চলছে বাস। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাসের ভিতরে চলে ‘কাহানী বাস বাস কি’র বাহারি গানের আসর। সূর্যিমামার দেখা মেলে আগ্রা পৌঁছে। বাস থামে তাজমহলের গেট থেকে কিলোমিটারখানিক দূরে। সেখান থেকে মিনিবাসে তাজমহলের গেটের সামনে নামি আমরা ১০০ জন ডেলিগেটস, সঙ্গে ৩ জন গাইড। এরপর চলে অবাক হয়ে গাইডের মুখে ভালবাসার এই সমাধিসৌধের নির্মাণ কাহিনী আর এর সৌন্দর্য উপভোগ। সাথে সাথে চলে এতদিন বই পত্রে পড়া তথ্যগুলো মিলিয়ে নেয়ার পালা। তাজমহলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা যমুনা নদী যেন এর সৌন্দর্যকে ১০০ গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। এরপর গেলাম আগ্রা দূর্গে। লাল পাথরে ঘেরা বিশাল দূর্গটি দেখে মনে হলো, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য্য, ক্ষমতা নিয়ে বাকিদের ওপর আগ্রা দূর্গ যেন একাই শাসন করছে। এই দূর্গ থেকে তাজমহলের সৌন্দর্য্য দেখাটা অন্যরকম রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল। এরপর আবার ‘কাহানী বাস বাস কি’ গানের আসরে ভাঙগা ভাঙগা গলায় গান গাইতে গাইতে আমরা দিল্লীতে ফিরে আসি।

ঐতিহাসিক কুতুব মিনারে: পরদিন সকালেই প্রবাসী কল্যান মিউজিয়াম দেখার পর কুতুব মিনার দেখতে গেলাম। ঢুকতেই মূল মিনার চোখে পড়ল। মিনারের পাথরগুলো স্পর্শ করে নিজের অজান্তেই যেন অনেক পেছনে চলে গেলাম। আশেপাশের ধ্বংসাবিশেষ ও স্থাপনাগুলো দেখে মুদ্ধ হলাম।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে রওনা হলাম এয়ারপোর্টের দিকে, এবার গন্তব্য গুজরাট, মোদীর শহরে।   

গুজরাটে মোদী ম্যজিক: মহাত্মা গান্ধীর বিখ্যাত অমরাবতী আশ্রম ঘুরে আমাদের গুজরাট ভ্রমণ শুরু হলো। আশ্রমের ভেতর গান্ধীর ‘সুতার কল’ ও ‘চশমা’ রাখা। সুতা কিভাবে কাটতে হয় তা নিজ হাতে, নিজ চোখে দেখলাম। এরপর টাটা কারখানাতে ঘুরে ঘুরে গাড়ি তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নিজ চোখে দেখে সত্যি অনেক ভাল লেগেছে আমার। বিকালে গুজরাট টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হলো দু-দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়। তার আগে চলে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরিবেশন করা হয় দেশের গান, রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাচ, মুখাভিনয়। নিজের দেশের সংস্কৃতিকে গুজরাটের মঞ্চে স্বগৌরবে উপস্থাপন করেন আমাদের আমাদের ১০০ তরুণ-তরুণীরা। এরপর গুজরাটি শিক্ষার্থীরা এবং আমরা মিলে ৫মিনিট গুজরাটি নাচ নাচি।

গুজরাটের বাকি দিন গুলি: গুজরাটের আহমেদাবাদ, গান্ধী নগরে ৩ দিন অবস্থান করেছিলাম আমরা। গুজরাট ঘুরে আমার যে উপলব্ধি হলো ‘ভারতের বিদেশে আমরা’। আসলে পশ্চিমা কোন দেশে গিয়েছিলাম আমরা। দেখেছিলাম টাটা কোম্পানি, রিলায়েন্স গ্রুপ, ডান্ডি কুটির, গান্ধীর বাসস্থান, ধীরুভাই অ্যাসেমব্লি ইনস্টিউটি অব ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনলজি, আদালজ স্টেপওয়েল ও মনোরম সিনেমা। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী হওয়ায় টাটা কারখানা ও ডান্ডি কুটিরে গিয়ে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছি।

পরিকল্পিত গুজরাট নিয়ে স্থানীয়রা বলছিলেন, গুজরাট মানে মোদী ম্যাজিক। তবে আফসোস থাকলো দেখতে পেলাল না ‘স্পেস সেন্টার’। গুজরাট ভ্রমণ শেষে ঢাকার বন্ধু কলকাতায় যাবো বলে রাত ৩টায় হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলাম। ভোর ৬টার ফ্লাইট ধরে পৌঁছলাম সলাম ১০টায়।

দাদাদের শহরে ১০০ বাংলাদেশির দাদাগিরি: চলে এসেছি ট্রামের শহর কলকাতায়। কলকাতা এয়ারপোর্টে এসেই এক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম, সবাই যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছি, চারিদিকে বাংলা লেখা, পথে ঘাটে বাংলা লেখা দেখেই ভাললাগা কাজ করছিল। এবার মটকা চা কিনতে গিয়ে বাংলায় কথা বলতে পারব ভেবেই সবাই আনন্দের শেষ নেই। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা ২ দিদি আমাদের গোলাপ দিয়ে দাদার শহরেআমন্ত্রণ জানান। কলকাতার বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে দিলেকোঠা খুঁজেছি আমি।

দাদাদের শহরে আমরা যাত্রা শুরু করলাম স্বামী বিবেকানন্দ আশ্রম দিয়ে, পরে ভিক্টোরিয়া মিউজিয়াম। সাদা পাথরে রাজকীয় এই মেমোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে। প্রবেশপথে পাথরের ছোট ছোট খন্ড রাখা আছে। মেমোরিয়ালের ভেতরে রানী ভিক্টোরিয়ার বিশাল মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাই। এরপর ফিরলাম হোটেল পিয়ারলেস ইনে। দুপুরে খেলাম বাঙ্গালী খাবার। এরপর সামান্য বিশ্রাম। হোটেলের সাথেই নিউমার্কেট। বিকেলে কলকাতার রাস্তা ঘুরে ঘুরে সাচ্ছ্বন্দে সবার কেনাকাটা আর প্রাচীন এই শহরটা কে চেনার প্রচেষ্টা। শহরে ঘুরে বেড়ানো। হেঁটে হেঁটে পানিপুরি, কুলফি খাওয়া। রাতে হোটেলের ট্যারিসে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডার কথা আমি আজো মিস করি।

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রপ্রেমে হারিয়ে যাওয়া: পরদিন মানে ১১ ডিসেম্বর ছিল আমাদের সফরের শেষ দিন। সকাল থেকেই সবার খুব মন খারাপ ছিল, ব্রেকফার্স্ট টেবিলে যেন আগের দিনের হাহাহিহি ব্যপারটা ছিল না, সবকিছু থমথমে। আসার আগে সবার ফোন নম্বর নেয়া, সব বন্ধুদের নিজ নিজ শহরে আমন্ত্রণ করা, শেষবারের মত নিজেদের জড়িয়ে ধরা এতেই কিভাবে যেন ১০টা বেজে যায়। শেষ দিনের সকাল টা শুরু হলো ইডেন গার্ডেন পরিদর্শনের মাধ্যমে। সফরের ৫০ তরুণের এই স্টেডিয়াম দেখে আবেগ আপ্লুত হতে দেখে আমার সত্যি খুব ভাল লেগেছে। সফরসঙ্গী ক্রিড়াবিদ ভাইয়া আপুদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন ঔইখানেই থেকে যাবেন সারাজীবন, উনারা আর ফিরে আসতে চান না। পরে প্রিন্সেস ঘাট ঘুরে গঙ্গার জল দেখলাম। আমার হিন্দু সফরযাত্রীদের গঙ্গাজলের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস দেখে ভাল লেগেছে আমার। দেখলাম অদূরের বিখ্যাত হাওড়া ব্রিজ। এরপর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে গেলাম। রবীন্দ্রনাথ বাঙালীদের প্রাণের সাথে কতটা জড়িয়ে আছে তা সেখানে না গেলে বোঝা যেত না। আমরা ১০০ তরুণ যারা সবাই সেলফি পাগল তারা ১ঘন্টার জন্য সব যান্ত্রিকতা ভূলে গেছিলাম। ছবি তোলার কথা তো দূরের কথা নিজের নাম টাও যেন ভূলে গেছিলাম, নিজেকে রবীবাবুর কোন গল্পের নায়িকা ভাবতেই যেন বেশি ভাল লাগছিল তখন। সামনের সুবিশাল উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে বসে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতেই কখন যে সময় শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।

বিকেল ৪টায় বাসে করে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা। কলকাতার বন্ধুরা বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে হাজির। তাদের বিদায় জানাতে খারাপ লাগছিল, বিশেষ করে অতুল রায় ও মোহন লাল, উনারা দুই জন সর্বক্ষণ যে সম্মান, সহযোগিতা আর ভালবাসা আমাদের সবাইকে দিয়েছেন, তারা যেন এই ৮দিনে আমাদেরই একজন হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের ছেড়ে আসতে গিয়ে নিজের কাউকে ছেড়ে আসার কষ্ট অনুভব করছিলাম আমরা সবাই। সন্ধ্যায় একঝুড়ি ভালোবাসা, অভিজ্ঞতা, অতিথিয়তা, সম্মান আর ভাললাগা নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশ্যে কলকাতা ছাড়ি আমরা। অবশেষে ৮দিন পর রাত ১০টায় প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে এলাম আমরা পঞ্চম বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন প্রতিনিধিদল। মজার ব্যাপার হলো সফরসঙ্গী নন, বরং সফর নিয়ে সবার আগে ফেসবুকে একেরপর এক ছবি পোস্ট করে একশ তরুণের মনে জায়গা করে নেন ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার রঞ্জন মন্ডল দাদা।   

ঢাকা, ১২ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।